আজ- ১৫ই আগস্ট, ২০১৮ ইং, ১লা ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার  রাত ১:২৬

বাঙালির সর্বজনীন উৎসব আজ

 

বুলবুল মল্লিক:


‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা/এসো হে বৈশাখ এসো এসো’- প্রাণের এ প্রত্যাশা নিয়ে পূর্ব দিগন্তে উদিত হলো ১৪২৫ বঙ্গাব্দের প্রথম সূর্য। শুভ বাংলা নববর্ষ-১৪২৫। নতুন আলোর কিরণধারায় শুরু হলো সুন্দর আগামির পথচলা। আজ পহেলা বৈশাখ। সর্বজনীন বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভেসে বেড়ানোর দিন। তাই গ্রাম থেকে শহর, নগর থেকে বন্দর, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ থেকে অফুরান প্রকৃতি সবখানেই আজ দোল দেবে বৈশাখী উন্মাদনা।
জরাজীর্ণকে পেছনে ফেলে নতুনকে বরণ করে নিতে লাখো কণ্ঠে বেজেছে তারই সুর। ডাক উঠেছে ধর্মান্ধ অপশক্তির ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে কুসংস্কার আর কূপমন্ডূকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে জাতিসত্তার পরিচয় করিয়ে দেয়ার।
আজ গোটা দেশজুড়ে সুরে সুরে ধ্বনিত হবে জাতির মঙ্গলবার্তা। আর এই মঙ্গলালোকে স্নাত হতে বাঁধভাঙা জোয়ারে মানুষ আছড়ে পড়বে শহর-বন্দরসহ প্রতিটি জনপদে। গোটা রাজধানীজুড়ে সৃষ্টি হবে এক অভাবনীয় দৃশ্যের। সকালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের সুর ধ্বনিতে মানুষের যে অংশগ্রহণ দিনমান এমনই ব্যস্ততা থাকবে সবখানে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক এ উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা হবে গোটা দেশ। হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত সমৃদ্ধ এ সংস্কৃতির চেতনা বিকশিত বাঙালির দেহ-মনে। বসনে-ভূষণে বৈশাখকে ধারণ করে বাঙালি মেতে উঠবে প্রাণের জোয়ারে। বাঙালির ঘরে ঘরে নানা আচার-আয়োজনে থাকবে নববর্ষের নানা আয়োজন। সেই সঙ্গে পান্তা ইলিশ, মুড়িমুড়কি, খই আর মন্ডা-মিঠাই বাতাসার স্বাদ গ্রহণের হিড়িক। আড্ডা, আমন্ত্রণ, উচ্ছ্বাসে কাটবে সারা দিন। শহুরে মানুষের গৎবাঁধা জীবনযাত্রায় যোগ হবে ভিন্নতার নতুন সুর।
বাঁশিতে ভোরের রাগালাপ দিয়ে এবার রাজধানীতে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হবে। সঙ্গে থাকবে সম্মেলক গান ও দেড় শতাধিক শিল্পীর দুই ঘণ্টাব্যাপী প্রভাতী আয়োজন। সে লক্ষ্যে রমনার বটমূল সেজেছে বর্ষবরণের রঙে।
শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাওয়া নানা আনুষ্ঠানিকতার মাঝে চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্ণিলরূপে ধরা দেবে। লালন সাঁইজির গানের অমিয় বাণী ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’- এ প্রতিপাদ্যে সেখান থেকে সুন্দর, সুখী ও হানাহানিমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানানো হবে। এছাড়াও ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে বসবে গানের আসর; বাংলা একাডেমিতে বৈশাখী মেলা। নবীন গ্রীষ্মের প্রখর তাপ উপেক্ষা করে পথে পথে ঘুরে, কখনো বা রমনা-সোহরাওয়ার্দী-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গাছতলায় বসে তুমুল আড্ডায় মেতে কেটে যাবে নগরবাসীর উৎসবের সারাবেলা।
এদিকে বর্ষবরণকে ঘিরে রমনার বটমূল এলাকা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, কূটনৈতিকপাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারম্নকলা ইনস্টিটিউট ও টিএসসিসহ প্রতিটি অনুষ্ঠানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে পুলিশ। বর্ষবরণ এলাকাগুলোয় সুপেয় পানি, গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা এবং ময়লা-আবর্জনা ফেলতে ভ্রাম্যমাণ ডাস্টবিন রাখা হয়েছে। তাৎক্ষণিক কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রম্নত হাসপাতালে নিতে প্রস্তুত থাকছে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স। ইভটিজিং বন্ধে সাদা পোশাকধারী পুলিশ গোটা এলাকায় টহল দেবে। পুলিশ ওর্ যাবের কন্ট্রোল রুম সার্বক্ষণিক খোলা রাখা হবে। রমনা পার্ক ও ধানম-ির রবীন্দ্র সরোবরের আশপাশের লেকগুলোয় মোতায়েন থাকবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একাধিক ডুবুরিদল। অগ্নিনির্বাপণের কাজে নিয়োজিত থাকবেন ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্ষবরণ উপলক্ষে দেশের জেলা, উপজেলা ও মহানগর এলাকায় অনুষ্ঠিতব্য বৈশাখী মেলা, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক উৎসবসহ নানা ধরনের প্রদর্শনীতে বিভাগীয় কমিশনার, দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশ, সব বিভাগের পুলিশের ডিআইজি, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপাররা সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন।
বাংলা সনের প্রবর্তন কবে হয়েছিল, কে তার প্রবর্তক তা নিয়ে পন্ডিতমহলে আছে নানা বিতর্ক। বেশিরভাগ মানুষেরই মত, মোগল সম্রাট আকবর এর প্রবর্তক। তিনি ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে, হিজরি ৯৬৩ সনে যে ‘তরিক-ই-ইলাহি’ নামের নতুন সনের প্রবর্তন করেছিলেন দিল্লিতে তখন থেকেই আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলা সনের গণনা শুরু হয়েছিল। তবে রাজা শশাঙ্ক, সুলতান হোসেন শাহ ও তিব্বতের রাজ স্রংসনকেও বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করেন কেউ কেউ। ‘সন’ শব্দটি আরবি এবং ‘সাল’ শব্দটি ফারসি। এই শব্দ দুটির কারণে বাংলা সন বা সাল মুসলিম শাসকদেরই প্রবর্তিত বলে পন্ডিতরা মনে করেছেন। বৈদিক যুগে অঘ্রাণকে বছরের প্রথম মাস বলে গণ্য করা হতো। তবে এই অঞ্চলের চাষাবাদের সঙ্গে মিলিয়ে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ফসলি সন হিসেবে বৈশাখকেই বছরের প্রথম মাস ধরে বাংলা সনের গণনা শুরম্ন হয়েছিল। সুবেদার মুর্শিদ কুলি খানের সময়ে বৈশাখ মাসের শুরুতে খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে পহেলা বৈশাখে এক ধরনের আর্থসামাজিক আনন্দ-উৎসবের সূচনা হয়েছিল বলে গবেষকেরা মনে করেন।
বছরের প্রথম দিনে আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার রীতি-রেওয়াজ মানবসমাজে সুপ্রাচীন। কৃষিপ্রধান বাংলায় খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বছরের প্রথম দিনে পুণ্যাহের আয়োজন করতেন রাজা বা জমিদাররা। প্রজারা এ দিন খাজনা দিয়ে নতুন বছরের জন্য জমির পত্তন নিতেন। জমিদাররা প্রজাদের জন্য আয়োজন করতেন ভোজের। আরও একটি অনুষ্ঠানের সংযোগ ঘটেছিল পহেলা বৈশাখে; সেটি হালখাতা। ব্যবসায়ীরা এর আয়োজন করতেন। সাংবাৎসরিক যারা বাকিতে কেনাকাটা করতেন তাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। উত্তম আহারাদির বন্দোবস্ত করা হতো। দোকানঘরটি ধুয়েমুছে করা হতো ঝকঝকে। ছিটানো হতো পঞ্চবটির পাতা ভেজানো পবিত্র জল। আপ্যায়ন শেষে পুরনো বাকি শোধ করে খাতকেরা আগামও কিছু জমা করে যেতেন নতুন খাতায়। পুণ্যাহ ও হালখাতা ছিল মূলত অর্থনীতিনির্ভর অনুষ্ঠান। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পুণ্যাহ আয়োজন বন্ধ হয়ে যায় এবং হালখাতাও তার জৌলুশ হারাতে থাকে।
নববর্ষ উপলক্ষে পত্রপত্রিকাগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ সংখ্যা। বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠান।
বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে দেশের সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশন করা হবে। শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ও কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় জাদুঘর ও প্রত্নস্থানসমূহ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। শিশু-কিশোর, প্রতিবন্ধী ও ছাত্রছাত্রীরা বিনা টিকিটে আজ জাদুঘর পরিদর্শন করতে পারবে।
নগরীর অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলো এবং রমনা ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশে ভ্রাম্যমাণ রেস্টুরেন্টগুলো আয়োজন করেছে ইলিশ-পান্ত্মার। অনেকের বাসাবাড়িতে তৈরি হবে বাঙালি খাবার-ইলিশ মাছভাজা, শুঁটকি-বেগুন-ডাল-আলু-কালিজিরাসহ নানা পদের ভর্তা। আবার অনেকের ঘরে সর্ষে ইলিশও থাকবে। কায়মনে বাঙালি হয়ে উঠার বাসনা ছাড়া সব কিছুই তুচ্ছ মনে হবে সবার। শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্ত্মরেই নয়, পৃথিবীর যেখানেই বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষী মানুষ রয়েছে সেখানেই বর্ণাঢ্য উৎসবের পালিত হবে পহেলা বৈশাখ।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করেছে

 
 
 

0 Comments

You can be the first one to leave a comment.

 
 

Leave a Comment

 




 
 

 
 
 

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল
আশ্রম মার্কেট ২য় তলা, জেলা সদর রোড, বটতলা, টাঙ্গাইল-১৯০০।
ইমেইল: dristytv@gmail.com, info@dristy.tv, editor@dristy.tv
মোবাইল: +৮৮০১৭১৮-০৬৭২৬৩, +৮৮০১৬১০-৭৭৭০৫৩

shopno