আজ- ১৮ই এপ্রিল, ২০১৯ ইং, ৬ই বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ শুক্রবার  ভোর ৫:৩২

ভারতে বৃহত্তম গণতন্ত্রের উৎসব :: আশঙ্কিত মায়াবতী, শঙ্কিত মোদি

 

দৃষ্টি ডেস্ক:

ভোট আসে, ভোট যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর রঙিন প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে ভেসে যায় দরিদ্র মানুষ। থমকে যায় তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন। এরপরও নির্বাচন এলে কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখে, এবার বুঝি মুক্তি মিলবে! সেই স্বপ্ন নিয়ে আজ শুরু হচ্ছে বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের লোকসভার নির্বাচন। ভারত বিশ্বের সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও উদীয়মান শক্তি। এ কারণে সারা বিশ্বের দৃষ্টি এই নির্বাচনের দিকে। আর নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের নির্বাচনে বাংলাদেশের সবার কৌত‚হল একটু বেশি। এ ছাড়া বাংলাদেশ-ভারতের রয়েছে বহুমাত্রিক সম্পর্ক। ভারতের নির্বাচন কতটুকু প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর? দুই দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে পালাবদল ঘটলে বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে নাকি খারাপ হবে? চায়ের টেবিল থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন সর্বত্রই ভারতের লোকসভার নির্বাচনের আলোচনা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ঐতিহাসিক। সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, আকাশ সংস্কৃতির রয়েছে ব্যাপক মেলবন্ধন। এই সম্পর্ক বাড়ছে উত্তরোত্তর। ভারতের জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক। ফলে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কোনো আঁচড় পড়ে না।
এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত আমাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। ভারতের নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক আমাদের সম্পর্কের কোনো সমস্যা হবে না। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের প্রতিবেশীর সঙ্গেও বিভিন্ন আলোচনার বিষয় রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা সমুদ্র এবং স্থলসীমানাসহ অনেক ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেছি। অন্যান্য বিষয়ও সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির আশা করছি। নতুন সরকারের সঙ্গে পারস্পরিক এই সমঝোতার মাধ্যমে আমাদের ঊষ্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকবে। আজ ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ৭ ধাপের এ লোকসভা নির্বাচন শেষ হবে ১৯ মে। ২৩ মে ভোট গণনা হবে। ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে এবার ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৯০ কোটি। ভোটারদের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ৪৩ কোটি ২০ লাখ। এই নির্বাচনে একদিকে রয়েছে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস জোট। এ ছাড়া নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন পশ্চিমবাংলার তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রয়েছে উত্তর প্রদেশের মায়াবতী-অখিলেশের বহুজন সমাজবাদী দলও। নির্বাচনের নানা কূটচাল লক্ষ করে মায়াবতী আশঙ্কিত এবং মোদি শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
সম্প্রতি রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে, ভারতীয় কৃষকদের পড়তি আয় ও বেকারত্ব ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জনসমর্থনে লাগাম টেনে ধরতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতকে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাঁচ বছর আগে দলটি যে অভাবনীয় জয় পেয়েছিল, চাকরির বাজারে প্রবেশ করা লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারছে না ভারতের ক্ষমতাসীন দলটি। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের দাম কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষকদের আশ্বস্ত করতে না পারায় দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশটির ঔজ্জ্বল্য অনেকখানিই মিইয়ে গেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি রাজ্যে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ও কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে ধরাশায়ী হওয়ার পর হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি চাপে পড়েছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ উন্মাদনা দলটিকে ফের এগিয়ে দিয়েছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের পুলওয়ামায় জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ-ই-মোহাম্মদের প্রাণঘাতী গাড়িবোমা হামলার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা চালায় ভারতীয় বিমানবাহিনী। এরপর থেকেই মোদি নিজেকে জাতীয় নিরাপত্তায় প্রহরী হিসেবে চিত্রিত করে যাচ্ছেন, বিরোধীদের বলছেন ‘দুর্বল’, কখনো কখনো তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্নও তুলছেন। বিজেপির প্রচারণার বেশিরভাগ অংশজুড়েই রয়েছে জাতীয়তাবাদ, জাতীয় নিরাপত্তা। তাদের ইশতেহারেও এগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেস চাইছে কৃষকদের দুশ্চিন্তা, গ্রামীণ সংকট ও বেকারত্বকে সামনে নিয়ে আসতে। কারণ সব ছাপিয়ে নির্বাচনে গুরুত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে বেকারত্ব ইস্যু। কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখানো এবং বাস্তবায়ন করা দলের ওপরই আস্থা রাখবেন বেকার তরুণরা। আর এদিকটাই লুফে নিয়েছে দুই প্রধান দল। ফলে তাদের প্রচারণাও প্রাধান্য পাচ্ছে বেকারদের কর্মসংস্থান। এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির ভোরের কাগজকে বলেন, প্রতিটি রাষ্ট্রই তাদের জাতীয় ইস্যুকে প্রাধান্য দেবে এটাই স্বাভাবিক। ভারতের নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা তাদের দেশের ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে পরে পার্শ্ববর্তী দেশকে নিয়ে ভাববেন। এ ক্ষেত্রে আমাদের খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। তাদের প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব রয়েছে। দুদেশের বন্ধুত্বকে এগিয়ে নেয়া সবার দায়িত্ব। আর আমাদের প্রত্যাশা হবে, নতুন যে সরকার আসবে, সেই সরকার আগের সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।

এদিকে অর্থনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও ভারতের কোটি কোটি মানুষ এখনো চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে ভারতের ১৭ কোটি ৬০ লাখ লোক চরম দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল, মাথাপিছু দৈনিক দুই ডলারেরও কম আয়ে তাদের জীবনধারণ করতে হতো। দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেক দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে। যদিও ভারত ইতোমধ্যে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য স্থল ও নৌশক্তির পাশাপাশি দেশটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতেও অগ্রগতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা শত্রুপক্ষের গোয়েন্দা উপগ্রহ ধ্বংস করার সক্ষমতাও অর্জন করেছে দেশটি। ভারতের সামরিক উত্থানকে বাংলাদেশের জন্য সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখছেন দেশের বিশ্লেষকরা। তাদের দাবি, ভারত একাত্তরের মতোই বাংলাদেশের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে। এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, সম্পর্কের অবনতি তো ঘটবেই না বরং দিন দিন আরো উন্নতি হবে। ২০১৪ সাল পরে যখন বিজেপি ক্ষমতায় এলো, তখন মনে হয়েছিল, আমাদের সম্পর্কে হয়তো অবনতি ঘটবে। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সম্পর্কের আরো উন্নতি ঘটেছে। অতএব ভারতের নির্বাচনে কোন দল জিতল এ নিয়ে আমাদের তেমন মাথাব্যথা নেই। তিনি বলেন, ভারতের চুক্তির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়ে গেছে। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি থেকে ছিটমহল পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে। ভারত-নেপাল কানেকটিভিটি চুক্তিতে আমরাই এগিয়ে রয়েছি। তিস্তা নিয়ে আমরা এখনো কোনো সমাধানে আসতে পারিনি এটা সত্য। তবে এখানে অনেক সমস্যা রয়েছে। এটি শুধু বাংলাদেশ বা পশ্চিমবাংলার বিষয় নয়। আরো কয়েকটি রাজ্য জড়িত। তবে আমি অত্যন্ত আশাবাদী মানুষ। নতুন যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের সঙ্গে আমাদের সরকার আলোচনায় বসে একটা সুরাহা করবে, এটা আমার বিশ্বাস। আর অভিন্ন নদনদীর ক্ষেত্রে আমাদের দেশের একদল মানুষই চান না সমাধান হোক। তারা সবকিছুতেই খুঁত ধরেন। দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে এদের কখনোই আমলে নেয়া উচিত নয়।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করেছে

 
 
 

0 Comments

You can be the first one to leave a comment.

 
 

Leave a Comment

 




 
 

 
 
 

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল
আশ্রম মার্কেট ২য় তলা, জেলা সদর রোড, বটতলা, টাঙ্গাইল-১৯০০।
ইমেইল: dristytv@gmail.com, info@dristy.tv, editor@dristy.tv
মোবাইল: +৮৮০১৭১৮-০৬৭২৬৩, +৮৮০১৬১০-৭৭৭০৫৩

shopno