আজ- ২৩শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ সোমবার  ভোর ৫:০৪

কবিগুরুর ১৬১তম জন্মদিন আজ

 

বুলবুল মল্লিক:

বর্ষ পরিক্রমায় ১৪২৯ বঙ্গাব্দেও ফের দ্বারে এসে দিল ডাক- পঁচিশে বৈশাখ। ১৬১তম রবীন্দ্রজয়ন্তী আজ। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাঙালির যাপিত জীবনাচরণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তার জন্মতিথি।

যিনি নিজের অমর সৃষ্টি গল্প, কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প ও অসংখ্য গানে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে তুলে ধরেছিলেন। বাঙালির অস্তিত্ব ও চেতনার সঙ্গে মিশে আছেন রবীন্দ্রনাথ। তার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য জায়গা দখল করে আছে। সব গণ্ডি ও নির্দিষ্ট সীমারেখা পেরিয়ে নিজের অমর সৃষ্টির সুবাদে হয়েছেন বিশ্বকবি। তার সাহিত্যকর্ম, সংগীত, জীবনদর্শন, মানবতা, ভাবনা- সবকিছুই সত্যিকারের বাঙালি হতে অনুপ্রেরণা দেয়।


শান্তিনিকেতনের ছায়া সুনিবিড় প্রান্তরে সরবে-নীরবে বহুবার বাঙালির প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালিত হয়েছে। তবে ৬২তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন ছিল অপূর্ব এক প্রাপ্তির। তখন ১৩২১ বঙ্গাব্দ। শান্তিনিকেতনের বৃক্ষ ছায়ায় গ্রীষ্মের দিনগুলোর সঙ্গে নিমগ্ন কবি উপহার দিয়েছিলেন ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতাখানি। জন্মদিনে সেই কবিতায় লিখেছিলেন- রাত্রি হলো ভোর / আজি মোর / জন্মের স্মরণ পূর্ণবাণী, প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি / হাতে করে আনি / দ্বারে আসি দিল ডাক / পঁচিশে বৈশাখ।’


আশি বছরের জীবন সাধনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জন্ম এবং মৃত্যুকে একাকার করে তুলেছেন অজস্র অমরতার শাশ্বত বার্তায়। তাই জন্মদিন নিয়ে তিনি লিখেছিলেন- ‘ওই মহামানব আসে / দিকে দিকে রোমাঞ্চ / মর্ত্যধূলির ঘাসে ঘাসে’। সেই তিনিই আবার জীবন সায়াহ্নে লিখলেন- ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি তোমাদেরই লোক।’

তিনি ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, কথাশিল্পী, চিত্রশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, ছোট গল্পকার ও ভাষাবিদ। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি চিত্রকর হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। গল্পে, উপন্যাসে, কবিতায়, সুরে ও বিচিত্র গানের বাণীতে, অসাধারণ সব দার্শনিক চিন্তাসমৃদ্ধ প্রবন্ধে, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতিসংলগ্ন গভীর জীবনবাদী চিন্তাজাগানিয়া লেখায় এমনকি চিত্রকলায়ও সর্বত্রই রবীন্দ্রনাথ চির নবীন।


তার কাছ থেকেই আমাদের জাতীয় সংগীত ও ‘বাংলাদেশ’ নামের বানানটি নেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান বাঙালি তথা বাংলাদেশিদের যাপিত জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। সৃষ্টিই যে এই নশ্বর জীবনকে অবিনশ্বরতা দেয়, সে কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন বলেই তিনি অমন দৃঢ়তায় বলতে পেরেছেন- ‘মৃত্যু দিয়ে যে প্রাণের / মূল্য দিতে হয় / সে প্রাণ অমৃতলোকে / মৃত্যুকে করে জয়।’


প্রথম এশীয় হিসেবে ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করে রবিঠাকুর বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন।


বাংলা ১৩৪৮ সালের ২২ শ্রাবণের (ইংরেজি ১৯৪১ সালের ৬ আগস্ট) বাদলঝরা দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীতে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিগুরুর মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে ওই দিনই শোকার্ত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন ‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপারে কোলে / বাংলার কবি শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি তুমি চলে যাবে বলে / শ্রাবণের মেঘ ছুটে এলো দলে দলে।’


নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আজ নোবেল বিজয়ী এই বাঙালি কবিকে স্মরণ করবে তার অগণিত ভক্তরা। শুধু দুই বাংলার বাঙালিই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলা ভাষাভাষী কবির জন্মবার্ষিকীর দিবসটি পালন করবে হৃদয় উৎসারিত আবেগ ও শ্রদ্ধায়।

বিটিভিসহ বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেল ও বেতারে সম্প্রচার করা হবে বিশ্বকবির জন্মজয়ন্তীর নানা অনুষ্ঠানমালা। জাতীয় সংবাদপত্রগুলোও বিশেষ সাময়িকী প্রকাশ করেছে। এবার জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘মানবতার সংকট ও রবীন্দ্রনাথ।’ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।


রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এ অঞ্চলের জনগণের প্রেরণাশক্তি। তার গান, সাহিত্য ও কর্মচেতনা বাংলাদেশের মানুষকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। পাকিস্তানবাদী সংস্কৃতির বিপরীতে রবীন্দ্রসাহিত্য ছিল আমাদের প্রধান অবলম্বন।

রবীন্দ্রনাথ শেষ জীবনে ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে প্রাচ্যদেশ থেকে এক মহামানবের আগমন প্রত্যাশা করেছিলেন; যিনি সমস্ত সংকট-সমস্যায় হবেন কাণ্ডারি; তিনি আর কেউ নন- স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে মহান ভাবাদর্শে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ছিল অন্যতম। বঙ্গবন্ধু এ জন্যই রবীন্দ্রনাথের গানকে জাতীয় সংগীত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে এবং জাতি হিসেবে সার্বিক মুক্তিচেতনায় তিনি আমাদের প্রেরণা হয়ে থাকবেন।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, বাঙালির অস্তিত্ব ও চেতনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ মিশে আছেন ওতপ্রোতভাবে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের গান হয়ে উঠেছিল প্রেরণার উৎস। শাশ্বত বাংলার মানুষের দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনা অর্থাৎ সব অনুভব বিশ্বস্ততার সঙ্গে উঠে এসেছে রবীন্দ্রসাহিত্যে।

তার জীবনাদর্শ ও তার সৃষ্টিকর্ম শোষণ-বঞ্চনামুক্ত অসা¤প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে চিরদিন বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করবে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন অহেতুক যুদ্ধ-সংঘাত, মৌলবাদের উত্থান, জাতীয়তাবোধের সংকীর্ণতা, শ্রেণি বৈষম্য, হানাহানি- এসবের কারণে রবীন্দ্রনাথ আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। রবীন্দ্র সাহিত্য আমাদের পাঠ করতে হবে প্রাত্যহিক জীবনবোধের আলোকে।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করেছে

 
 
 
 
 

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল
আশ্রম মার্কেট ২য় তলা, জেলা সদর রোড, বটতলা, টাঙ্গাইল-১৯০০।
ইমেইল: dristytv@gmail.com, info@dristy.tv, editor@dristy.tv
মোবাইল: +৮৮০১৭১৮-০৬৭২৬৩, +৮৮০১৬১০-৭৭৭০৫৩

shopno