*মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল*

বাংলাদেশ ও গণতন্ত্র- শব্দ দুটি দীর্ঘকাল ধরে একে অপরের পরিপূরক হওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত। তবে গত দেড় দশকের রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্ব, ভোটাধিকার হরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত ধ্বংসসাধন দেশটিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সেই দিকভ্রান্ত গন্তব্যহীনতা থেকে উত্তরণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দীর্ঘ পথচলায় ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং গণতন্ত্রের সংকট কাটিয়ে জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে দেশ এক নতুন দিগন্তে পদার্পণ করেছে।
গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন, ‘সত্য গোপন রাখা যায় না, সূর্য যেমন মেঘের আড়ালে চিরকাল ঢাকা থাকে না।’ দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশের গণতন্ত্র যে অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই মেঘ সরিয়ে এক নতুন সূর্যোদয় ঘটিয়েছে। এই নির্বাচনের ফলাফল কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জয় নয়, বরং এটি ছিল দিকভ্রান্ত গণতন্ত্রের সঠিক পথে প্রত্যাবর্তনের একটি ঐতিহাসিক মহেন্দ্রক্ষণ। এই মাহেন্দ্রক্ষণে দেশের সাধারণ মানুষের রায় এবং আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে গণজোয়ার দেখা গেছে, তার মূল কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে বিএনপি এবং জিয়া পরিবারের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। মহান স্বাধীনতার ঘোষক সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করে দেশকে একদলীয় শাসনের অন্ধকার থেকে মুক্ত করেছিলেন। সেই ধারবাহিকতায় বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আপসহীন ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে বীজ বপন করেছিলেন, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর তিন মেয়াদের শাসনামলে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রের এক সোনালী অধ্যায় প্রত্যক্ষ করেছে।
তার শাসনামলে (১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬) দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বিচারবিভাগের স্বকীয়তা এবং একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে গণতন্ত্র সঠিক পথে যাত্রা শুরু করেছিল। বেগম জিয়ার নেতৃত্বে শিক্ষা, নারী উন্নয়ন এবং অবকাঠামো খাতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল- তা ছিল মূলত জনগণের অংশগ্রহণে একটি জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থার প্রতিফলন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে সেই স্বর্ণালি অতীতই ছিল আজকের দিন বদলের প্রেরণা। তবে গত দেড় দশকে গণতন্ত্র যে পথ হারিয়েছিল, সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পথ থেকে উত্তরণের আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছেন তারেক রহমান।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি নির্বাচন ছিল না, এটি ছিল দিকভ্রান্ত গণতন্ত্রের সঠিক কক্ষপথে ফেরার সংগ্রাম। নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রতিফলন স্পষ্ট হয়। নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। জোটবদ্ধ রাজনীতির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে এবং এনসিপি ৬টি আসনে জয়ী হয়ে সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনের ভিত্তি তৈরি করেছে। মোট ১২,৭৭,১১,৭৯৩ ভোটারের এই বিশাল দেশে ভোটের গড় হার ছিল ৫৯.৪৪ শতাংশ। এই হার প্রমাণ করে সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে। বিদেশে অবস্থানকালীন নানা প্রতিকূলতা এবং দীর্ঘ সময় দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার পেছনে তারেক রহমানের যে শ্রম ছিল, তার চূড়ান্ত ফলাফল এই বিজয়। তিনি কেবল দলের হাল ধরেননি বরং তিনি তৃণমূলের রাজনীতিতে প্রাণের সঞ্চার করেছেন।
লন্ডন থেকে প্রযুক্তির মাধ্যমে তৃণমূলের প্রতিটি কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ ¯েøাগানকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া ছিল জয়ের প্রধান চাবিকাঠি। তারেক রহমান কেবল একজন বংশগত নেতা হিসেবে নয় বরং একজন প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার নেতৃত্বে গণতন্ত্র উত্তরণের এই প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে- ১. রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা: তারেক রহমান রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের যে ৩১ দফা রূপরেখা দিয়েছিলেন, তা আজ দেশের মানুষের কাছে ‘গণতন্ত্রের সনদ’ হিসেবে স্বীকৃত। এর মধ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২. অন্তর্ভুুক্তিমূলক রাজনীতি: ১২ ফেব্রুয়ারির বিজয়ের পর তারেক রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে অন্তর্ভুুক্তিমূলক ও ঐকমত্যের রাজনীতির ডাক দিয়েছেন। তিনি বারবার বলছেন, ‘দেশটি কেবল বিএনপির নয় বরং ১৮ কোটি মানুষের।’ এবং ৩. জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন: তার নির্দেশনায় তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা দিকভ্রান্ত গণতন্ত্রকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার একটি সাহসী পদক্ষেপ। বিগত বছরগুলোতে দেশ যখন একদলীয় কর্তৃত্ববাদের কবলে পিষ্ট, তখন সুদূর প্রবাসে থেকেও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং সাধারণ মানুষের মনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার কঠিন কাজটি করেছেন তারেক রহমান। তিনি কেবল দলের নেতা হিসেবে নয় বরং একজন রাষ্ট্রসংস্কারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার ঘোষিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র মেরামতের প্রস্তাবনা দেশের বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকের কাছে গণতন্ত্রের নতুন বøু-প্রিণ্ট হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। তার সুযোগ্য নেতৃত্বে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি যে কৌশল গ্রহণ করেছিল- তা ছিল অভূতপূর্ব। তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে তার নেতৃত্বের বিকল্প নেই। ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের জনগন সেই প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছে। তারেক রহমান কেবল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন না বরং তিনি আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে মাঠপর্যায়ের রাজনীতির এক নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের বিজয় কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের দাবিকে সুসংগঠিত করার ফসল।
একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে গণতন্ত্রকে পুনর্গঠন করা সহজ কাজ নয়। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের ম্যান্ডেট তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করেছে। দীর্ঘ শাসনামলে যে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ঘটেছিল, তা দূর করতে হলে নতুন সরকারকে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার করতে হবে। বিশাল এই জনরায়ের পর এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করা। পরিসংখ্যান বলছে, তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ (প্রায় ৪৫%) এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছে। এই বিপুল তরুণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়া এখন সময়ের দাবি। বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে গণতন্ত্র যেভাবে সঠিক পথে পরিচালিত হয়েছিল, তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই ধারা আরও আধুনিক ও সংস্কারমুখী হবে- এমনটাই দেশবাসী প্রত্যাশা করে।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, অন্ধকার যত গভীর হয়- ভোরের আলো তত উজ্জ্বল হয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্র দীর্ঘকাল এক অন্ধকার পথে হেঁটেছে। কিন্তু ১২ ফেব্রæয়ারির নির্বাচন এবং তারেক রহমানের সুদৃঢ় নেতৃত্ব প্রমাণ করেছে এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রকে অনেকটাই বেশি ভালোবাসে। দিকভ্রান্ত গণতন্ত্র আজ সঠিক পথের দিশা পেয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই বিজয় কেবল ব্যালট বিপ্লব নয় বরং এটি ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। বেগম খালেদা জিয়ার রেখে যাওয়া আদর্শ এবং শহীদ জিয়ার দর্শনে উজ্জীবিত হয়ে তারেক রহমান বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি আত্মমর্যাদাশীল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার ম্যান্ডেট পেয়েছেন।
তারেক রহমানের হাত ধরে দিকভ্রান্ত গণতন্ত্রের গলি থেকে বেরিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে পা রাখা বাংলাদেশ ধীরলয়ে সামনের দিকে অবিরাম হাঁটতে থাকবে আর হাঁটতে থাকবে- এটাই দেশবাসীর আত্মার প্রত্যাশা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
