আজ- ২৩শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং, ৮ই কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ মঙ্গলবার  রাত ৯:১৪

ভূঞাপুরে গরু-মহিষের আবাসিক হোটেল ব্যবসায় মন্দা!

 

বুলবুল মল্লিক:


যমুনার তীর ঘেঁষা টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী গরুর হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গরু-মহিষের আবাসিক হোটেল ব্যবসায় এবার মন্দাভাব দেয়া দিয়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গোবিন্দাসী হাটে প্রচুর গরু-মহিষের আমদানি হলেও ক্রেতা কম থাকায় পাইকাররা গরু-মহিষ নিয়ে অন্য হাটে চলে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে জানা যায়, গরুর হাটকে কেন্দ্র করেই অত্রাঞ্চলের রাজনীতি-অর্থনীতি আবর্তিত হচ্ছে। গোবিন্দাসীসহ অত্রাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান দিচ্ছে এই হাট। এই হাটকে ঘিরে এতদাঞ্চলের অনেকেই নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
গরু-মহিষের আবাসিক সুবিধা থাকার সুবাদেই গোবিন্দাসী গরুর হাট দেশের অন্যতম বৃহত্তম তথা দ্বিতীয় বৃহত্তর গরুর হাট হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে গরু-মহিষের আবাসিক হোটেলগুলোর ব্যবসাও থাকে বেশ জমজমাট। হোটেলেরই গরু-মহিষের যাবতীয় দেখভাল করার দায়িত্ব থাকে। নিরাপদে রাখার পাশাপাশি গোসল করানো, মশায় না কামড়ানো এবং খাওয়ানোর যাবতীয় ‘রুম সার্ভিস’ দেয় হোটেল কর্তৃপক্ষ। গোবিন্দাসী হাটকে কেন্দ্র করে এতদাঞ্চলে শতাধিক গরু-মহিষের আবাসিক হোটেল গড়ে ওঠেছে। প্রতিবছর গরু-মহিষের আবাসিক হোটেল থেকে আয়ের টাকায় জীবন চলে প্রায় তিন শতাধিক পরিবারের। কিন্তু এবার হাটে বেঁচা-বিক্রি কম হওয়ায় বিক্রেতারা গরু-মহিষ অন্য হাটে নিয়ে যাওয়ায় সবগুলো আবাসিক হোটেল চালু করা হয়নি। বুধবার(১ আগস্ট) সরেজমিনে দেখা গেছে, ৭০টির মতো আবাসিক হোটেলে অল্পকিছু গরু-মহিষ রয়েছে। অন্যগুলো এখনও চালু করা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, ষাটের দশকে গোবিন্দাসীতে ছোট আকারে একটি বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮০ সালের আগে পর্যন্ত গোবিন্দাসী একটি ছোট বাজারই ছিল। চরাঞ্চলের মানুষ প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতো। ১৯৯১ সালের প্রথমদিকে সপ্তাহে দুইদিন রোববার ও বৃহস্পতিবার হাট বসানো হয়। সে সময় সাধারণত বিকালে হাট বসতো। সন্ধ্যার পর ‘মশাল’ বাতি জ্বালিয়ে রাত ৭-৮টা পর্যন্ত দোকানপাট চালানো হতো। তখন স্থানীয়রা ৮-১০টা করে করে গরু-ছাগল হাটে তুলে বিক্রি করার চেষ্টা করে। কখনো বিক্রি হয়, আবার কখনো হয়না। ১৯৯৫ সালে সরকারিভাবে গোবিন্দাসী হাটের প্রথম ইজারা হয়। স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা ইকরাম উদ্দিন তারা মৃধা গোবিন্দাসী হাটটি মাত্র ৩২ হাজার টাকায় ইজারা নেন। ইজারার টাকা ওঠাতে তিনি হাটটির ব্যাপক প্রচারণা চালান। গোবিন্দাসী হাটটিতে নদী ও স্থল পথে যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনা করে দেশের সিলেট, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের গরু ব্যবসায়ীদের সাথে যোগাযোগ করেন। তাদেরকে হাটে আনতে নানা রকম প্রণোদনা চালু করেন। যেমন রংপুর, রাজশাহী বিভাগ ও ভারত থেকে গোবিন্দাসী হাটে গরু আনলে যমুনা নদীর পাড়াপাড়ের জন্য ফেরি ফ্রি, হাটে গরুর পাহারা ফ্রি এ রকম হরেক রকম প্রণোদনা। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাটমুখো করতে ট্রাক নিয়ে বিভিন্ন জেলায় মাইকিং করা হয়।
পাইকাররা শুরুতে ট্রাক ও নৌকায় গরু এনে হাটের আশপাশের মানুষের বাড়ির সামনে এনে জড়ো করে রাখতেন। ঝড়-বৃষ্টির সময় এসব বাড়ির গোয়ালঘরেই জায়গা হতো পাইকারদের কিছু গরুর। আশ্রয় পেতেন পাইকাররাও। বিনিময়ে তারা বাড়ির মালিককে নামমাত্র কিছু অর্থ দিতেন। এভাবে টাকা রোজগারের এই সহজ সুযোগ ও পাইকারদের চাহিদার কারণে হাটের আশপাশের বাসাবাড়ির মালিকরা তাদের খোলা জায়গায় টিনের ছাপড়া দিয়ে ঘর তুলে দেয় হাটে আসা গরু-মহিষের জন্য। ভাড়ার বিনিময়ে গরু রাখা শুরু হয় সেখান থেকেই। পরবর্তীতে এসব ঘরই পরিচিতি লাভ করে গরু-মহিষের আবাসিক হোটেল হিসেবে। দিন দিন বাড়তে থাকে এ হোটেলের সংখ্যা। হোটেলের গন্ডি ছড়িয়ে পড়ে গোবিন্দাসীর আশপাশের খানুরবাড়ি, ভালকুটিয়া, কুকাদাইর, রাউৎবাড়ি, জিগাতলা, বাগবাড়ি, স্থলকাশি, মাটিকাটা ও চিতুলিয়াপাড়াসহ অন্তত ১০-১২টি গ্রামে। গরু-মহিষের অঅবাসিক সুবিধা থাকায় হাট শুরুর প্রায় ২-৩দিন আগেই হাটে এসে এসব হোটেলে গরু-মহিষ রাখেন পাইকাররা। আর এ জন্য হোটেল মালিককে গরু প্রতি প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ টাকা দিতে হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে হাটে পাইকারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আবাসিক হোটেলের ভাড়ার কমিয়ে গরুপ্রতি ১০ টাকা করা হয়েছে। গোবিন্দাসী হাটে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকার ও ব্যাপারীরা গরু বেঁচা-কেনা করতে আসেন। তাদের থাকার জন্য এখানে যেমন আবাসিক হোটেল রয়েছে তেমনি তাদের গরু, মহিষ ও ছাগল নিরাপদে রাখার জন্যও রয়েছে গরু-মহিষের আবাসিক হোটেল। এসব গরু-মহিষের আবাসিক হোটেলের আয় থেকে যাঁরা সংসারের চাকা সচল রাখছেন তাদের অবস্থাও এবার খুব ভালো নয়। তবে, তারা আশা করছেন, আগামি ৯ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) থেকে হাট জমে ওঠার পাশাপাশি তাদেরও ভাগ্য খুলে যাবে।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করেছে

 
 
 

0 Comments

You can be the first one to leave a comment.

 
 

Leave a Comment

 




 
 

 
 
 

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল
আশ্রম মার্কেট ২য় তলা, জেলা সদর রোড, বটতলা, টাঙ্গাইল-১৯০০।
ইমেইল: dristytv@gmail.com, info@dristy.tv, editor@dristy.tv
মোবাইল: +৮৮০১৭১৮-০৬৭২৬৩, +৮৮০১৬১০-৭৭৭০৫৩

shopno