আজ- ৬ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ২৩শে বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ সোমবার  সন্ধ্যা ৭:৫৩

টাঙ্গাইলে উৎপাদিত পাটপাতার অর্গানিক চা যাচ্ছে বিদেশে

 

বুলবুল মল্লিক:

টাঙ্গাইলে বেসরকারি উদ্যোগে পুরোপুরি অর্গানিক পদ্ধতিতে তেতো পাট পাতার চা উৎপাদন হচ্ছে। আধুনিক টি-ব্যাগ পদ্ধতিতে বাজারজাত করা হচ্ছে। বর্তমানে পাট পাতার অর্গানিক চা ডেনমার্ক, ইউরোপ, আমেরিকা, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হচ্ছে।


সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোক্তা পর্যায়ে এ চা উৎপাদন করছেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন গ্রামের জাকির হোসেন তপু। তার উৎপাদিত পাট পাতার চা বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনেও স্থান পেয়েছিল। বাণিজ্যিকভাবে এ চা বাজারজাত করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান তিনি।


জানা যায়, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তা জাকির হোসেন তপু বেসরকারি পর্যায়ে পাটপাতার চা নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণায় সফল হয়েছেন। খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ক কোম্পানী মহিমা প্রোডাক্টসের ব্যানারে তার উৎপাদিত পাটপাতার চা বাজারজাত করা হচ্ছে।

জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেণ্টার(জেডিপিসি) জানিয়েছে, স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জলবায়ু সম্মেলনে অতিথিদের জন্য উপহার হিসেবে তারা বাংলাদেশ থেকে জাকির হোসেনের পাটপাতার অর্গানিক চা পাঠিয়েছিলেন। সেখানে এ চা ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এরপর থেকে এ চায়ের চাহিদা ক্রমেই দেশ-বিদেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাটপাতার চা অ্যাণ্টি অক্সিডেণ্টে পরিপূর্ণ। এ চা পানে ডায়াবেটিস রোগের বিশেষ উপকার হয়। শরীরের ইনফ্লামেশন কমিয়ে ওজন কমায়, ক্যান্সার, পেটের বিভিন্ন পীড়া, আলসার, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে কোলস্টেরল নিয়ন্ত্রণে এটি কাজ করে। পাশাপাশি ভালো ঘুম হতে সহায়তা করে। জ্বর, ঠা-া, ফ্লু নিয়ন্ত্রণ, দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা বৃদ্ধি, দাঁতের সুরক্ষা, পায়ের অসাড়তা দূর, অ্যাজমা নিয়ন্ত্রণে এটি অদ্বিতীয়।


পাট পাতার চা ২০১৮ সালে বাজারে এসেছে। বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি) ওই বছর পরীক্ষামূলকভাবে এ চা বাজারে ছাড়ে। সফলতা পাওয়ায় ২০১৯ সালে এটা বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা হয়। একেবারে নতুন এ পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ লক্ষ করে বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোক্তা গড়ে ওঠেছে। প্রচলিত চায়ের বিকল্প হিসেবে পাটপাতার চা দিন দিন প্রসার লাভ করছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি পাট পাতার এ চা রফতানি হচ্ছে।


সরেজমিনে পাট পাতার চায়ের স্থানীয় ক্রেতারা জানান, এ চায়ের অনেক গুন রয়েছে। মানব দেহের অনেক রোগমুক্তির ওষুধ হিসেবে কাজ করে এই পাটপাতার চা। তাই তারা উদ্যোক্তা জাকিরের কাছ থেকে কিনে নিয়মিত পান করছেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে পাটপাতার চায়ের বাজারও তৈরি হচ্ছে। লোকমুখে ও অনলাইনে জানতে পেরে প্রতিদিন প্রচুর উৎসুক দর্শনার্থী জাকিরের প্রজেক্টে ভির করছে।


কারখানা দেখতে আসা দর্শনার্থীরা জানায়, দেশে হর-হামেশা চাষ হওয়া পাট এক সময় দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখেছে- এখনও রাখছে। সেই তেতো পাটপাতা দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে চা তৈরি হচ্ছে জেনে তাদের মধ্যে পদ্ধতি দেখার আগ্রহ জন্ম নিয়েছে। তাছাড়া বেশ কিছুদিন আগে অনলাইন শপিং সেণ্টার দারাজ থেকে এই পাট পাতার চা তারা অর্ডার করেছিলেন। চা খেয়ে অনেক ভালো লেগেছে, প্রথম কয়েকদিন নিয়মিত পান করলেই শরীর অনেকটা চাঙ্গা হয়ে যায়- এটা প্রমাণিত। এজন্য তারা জাকির হোসেন তপুর প্রজেক্ট ঘুরে দেখার জন্য এসেছেন। তারা প্রজেক্ট দেখে মুগ্ধ হয়ে নিজের ও পরিবারের সকলের জন্য পাটপাতার চা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।


প্রজেক্টের কর্মচারীরা জানায়, এ পাটপাতার চা কারখানায় কাজ করে তারা নিজেদের পড়ালেখাসহ পরিবারকে সাহায্য করতে পারছেন। এই কারখানায় কাজ করার সুযোগ পেয়ে তাদের বেকারত্ব ঘুচেছে- লেকাপড়া চালাতে পরিবারের উপর নির্ভর করতে হচ্ছেনা। তারা পাট গাছ থেকে পাতা সংগহ করে রোদে শুকিয়ে কারখানায় একটি অর্গানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই চা তৈরি করে থাকেন।


তরুণ উদ্যোক্তা জাকির হোসেন তপু জানান, দেশীয় পাটের পাতা থেকে শতভাগ অর্গানিক পদ্ধতিতে পাটপাতার পানীয় বা চা প্রস্তুত করছেন। গুঁড়ো পাতা নয়- একেবারে স্বাস্থ্যসম্মত টি-ব্যাগ আকারে পাটপাতার চা বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে। উপকারী এ পানীয়র ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে স্বাস্থ্যগত দিক থেকে মানুষ যেমন উপকৃত হবে তেমনি পাটের ব্যবহার আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে। দেশের অর্থনীতিতে সাফল্যের নতুন একটা ধারা যোগ হবে।


তিনি জানান, পাট চাষের পর পাটগাছ বড় হলে গাছের আগার দিকের কিছু স্বাস্থ্যকর পাতা ছিঁড়ে মেশিনে শুকিয়ে সেগুলো গুঁড়া করে চা পাতার উপযোগী করা হয়। পরে সেগুলো সুদৃশ্য প্যাকেটে ভর্তি করে বাজারজাত করা হয়।


তিনি আরও জানান, বর্তমানে পাট পাতার এ চা ডেনমার্ক, ইউরোপ, আমেরিকা, জার্মানীসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হচ্ছে। এলসি বন্ধ থাকায় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে তিনি দেশের বাইরে চা পাঠাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাণিজ্যিকভাবে এ চা উৎপাদন করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখার স্বপ্ন দেখেন তরুণ উদ্যোক্তা জাকির হোসেন তপু।


টাঙ্গাইল বহুমূখী পাট শিল্প উদ্যোক্তা সেবাকেন্দ্রের(জেইএসসি) সেণ্টার ইনচার্জ মোহাম্মদ মেহের হুসাইন জানান, উদ্যোক্তা জাকির হোসেন তপু বেসরকারিভাবে ২০০৯ সাল থেকে পাট পাতার উপর গবেষণা শুরু করেন। এরপর তিনি পুরোপুরি অর্গানিক পদ্ধতিতে পাট পাতার চা উৎপাদন করছেন। এই চা সারাদেশেই পাওয়া যায়। পাটপাতার চা দেশের একটি বড় সম্পদ। সরকারিভাবে পাট চা উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে দেশের প্রত্যেক জেলা প্রশাসনকে পাটপাতা চা ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই চা বর্তমানে ডেনমার্ক, ইউরোপ, আমেরিকা, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। জাকির হোসেনের এই উদ্যোগকে তারা সাধুবাদ জানান। দেশের পাট পাতার চা এক সময় বিশে^র বাজার দখল করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করেছে

 
 
 
 
 

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল
আশ্রম মার্কেট ২য় তলা, জেলা সদর রোড, বটতলা, টাঙ্গাইল-১৯০০।
ইমেইল: dristytv@gmail.com, info@dristy.tv, editor@dristy.tv
মোবাইল: +৮৮০১৭১৮-০৬৭২৬৩, +৮৮০১৬১০-৭৭৭০৫৩

shopno