আজ- ২০শে জুন, ২০১৮ ইং, ৭ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার  রাত ১:০০

ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি- শেষপর্ব :: টাঙ্গাইল শাড়ির ডিজাইন ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান

 

বুলবুল মল্লিক:


টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি বাঙালি রমণীর প্রথম পছন্দ এবং তুলনামূলকভাবে অধিক জনপ্রিয়। অনেকে তাঁতের শাড়ি বলতে শুধু টাঙ্গাইলের শাড়িই বোঝেন! শাড়ি অত্যন্ত মোলায়েম ও আরামদায়ক হয়, কারণ এই শাড়ি তৈরিতে অতিমিহি সুতা ব্যবহার করা হয়। টাঙ্গাইলের শাড়ির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- পাড় বা কিনারের কারু কাজ। বিদেশি বণিক চক্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মসলিন কাপড় কালের প্রবাহে হারিয়ে গেছে। কিন্তু তার সার্থক উত্তরাধিকারী হয়ে আজও টিকে রয়েছে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি।
টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে নব্বই দশকের প্রথম দিকে। এ সময়ে টাঙ্গাইল কটন শাড়ির পাশাপাশি টাঙ্গাইল সফট সিল্ক শাড়ি তৈরি শুরু হয়। এ শাড়ি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে- একমাত্র তার আকর্ষনীয় ডিজাইন ও উন্নত বুনন এর কারণে। মাধবীলতা, পদ্মপাড়, কুঞ্চলতা, তেরবি, মরবি, লতাপাতা পাড়ের শাড়ি বেশি জনপ্রিয় ছিল তখনকার সময়ে। এখনকার যুগে টাঙ্গাইলের তাঁতীরা তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও যুগের চাহিদার সাথে সাথে বুননে এনেছে বৈচিত্র্যতা। সফট সিল্ক, হাফ সিল্ক ছাড়াও টাঙ্গাইলে তৈরি করা হয় বালুচরি, জরিপাড়, স্বর্ণচুড়া, ইককাত, আনারকলি, দেবদাস, কুমকুম, সানন্দা, হাজারবুটি, সূতিপাড়, কটকি, নীলাম্বরী, ময়ুরকন্ঠী ইত্যাদি শাড়ি।
খুব দরদ ও গভীর মনোসংযোগের সাথে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি তৈরি করা হয় এবং কারু কাজ করা হয় অত্যন্ত সুক্ষè ও সদৃশ্য ভাবে। পুরুষ এবং মহিলা উভয় মিলেই শাড়ি প্রস্তুত করে থাকেন তাদের আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। পুরুষেরা তাঁত বোনে; আর নারীরা চরকা কাটে। রঙকরা এবং জরির কাজে সহযোগিতা করে বাড়ির মহিলারা। শাড়ির জমিনে নানা ডিজাইন করে বা নকশা আঁকে, ফুল তোলে তাকে আরো মনোমুগ্ধকর করে তুলেন তাঁতীরা।
শাড়ির বুনন, রং, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ্য, কারুকাজ ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে শাড়ির দাম ভিন্ন ভিন্ন হয়। সমাজের সব ধরনের মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে এর দাম নির্ধারন করা হয়ে থাকে। তবে জামদানী এবং সিল্ক এর দামটা তুলনামূলক বেশি। দেশিয় চাহিদা মিটিয়ে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি বিদেশে সুনাম অর্জন করছে। এর খ্যাতি এখন বিশ্বজোড়া। ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, জাপান, সৌদিআরব, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যসহ বিভিন্ন স্থানে এর সুখ্যাতি রয়েছে।
টাঙ্গাইলের শাড়ি দেশের বিভিন্ন শপিং মল, মার্কেট, ফ্যাশন হাউসে পাওয়া যায়। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষ নিজেদের পছন্দ ও সাধ্যের মধ্যে কিনে নিয়ে যায় টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। সফট সিল্ক, হাফ সিল্ক ছাড়াও টাঙ্গাইলে তৈরি করা হয় বালুচরি, জরিপাড়, স্বর্ণচুড়া, ইককাত, আনারকলি, দেবদাস, কুমকুম ইত্যাদি। এসব শাড়ির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির দাম হচ্ছে- সফট সিল্ক ১০৫০-৬০০০ টাকা, সফট কটন ৭৫০-৪৫০০ টাকা, বালুচরি ১৮০০-৩৪৫০ টাকা, তসর সিল্ক ২০০০-৫৫০০ টাকা, সম্বলপুরী ৮৫০-৪০০০ টাকা, সিল্ক কাতান ৩০০০-১২০০০ টাকা।
সব বয়সের প্রায় সকল নারীই শাড়ি পড়তে ভালোবাসেন। অফিস পার্টি হোক বা ট্র্যাডিশনাল অনুষ্ঠান। যে কোনও জায়গাতেই টাঙ্গাইল শাড়ির জুড়ি মেলা ভার। নিত্যনতুন ফ্যাশনের সাথে পাল্লা দিয়ে তাঁতের শাড়ির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে বেশ ফ্যাশনেবল ও আরামদায়ক তাঁত শাড়ি পাওয়া যায়।
টাঙ্গাইলের তাঁতী রঘুনাথ বসাক, রতন বসাক এবং খোকন বসাকের যৌথ প্রতিষ্ঠান যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং। টাঙ্গাইল শাড়ির রাজধানী খ্যাত দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইলের প্রবীণ এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের সব ধরনের উৎসব ও ঋতু কেন্দ্রীক শাড়ি তৈরি করে। সুতি, সিল্ক, র-সিল্ক, হাফ সিল্ক, গ্যাস সিল্কসহ সব ধরনের শাড়িই তারা বুনেন। তাদের শাড়ি পাওয়া যায় দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ, শাড়ির প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য পোশাকের বিক্রয় কেন্দ্রে। মূলত তারা পাইকারি শাড়ি বিক্রি করেন, চাইলে অর্ডার দিয়ে নিজের নকশার শাড়িও তৈরি করিয়ে নিতে পারেন গ্রাহকরা। যোগাযোগ- যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং, মোবাইল-০১৭১১-৫৯৩০৬১, ০১৭১১-৫৯৩০৫৪,০১৭১৪-০২৮৬৯৬।
একই এলাকার তাঁতী নিমাই চন্দ্র বসাক এবং মন্টু বসাকের প্রতিষ্ঠান মনি ট্রেডার্স। সুতি, সিল্ক, র-সিল্ক, হাফ সিল্ক, গ্যাস সিল্কসহ সব ধরনের শাড়ি এবং উলের চাঁদর তারা বুনেন। দেশের বিভিন্ন উৎসব ও ঋতুকে সামনে রেখেই তাদের শাড়ি ও চাঁদরের রঙ ও নকশা করা হয়। পাইকারি বিক্রির পাশাপাশি তারা কেউ অর্ডার দিলেও পছন্দের নকশার শাড়ি ও চাঁদর তৈরি করে দেন। যোগাযোগ- মনি ট্রেডার্স, মোবাইল-০১৭১৩-০৩৬৬১৫, ০১৭১৮-২৩০০৪৩।
পাথরাইলের প্রবীণ তাঁতী বৈদ্যনাথ বসাক। তিনি শাড়ি তৈরি করেন দেশের বিভিন্ন উৎসব ও ঋতুর সাথে তাল মিলিয়ে। সুতি, সিল্কসহ সব ধরনের তাঁেতর শাড়িই তিনি তৈরি করেন। পাইকারি বিক্রির পাশাপাশি অর্ডার দিলেও পছন্দের নকশার শাড়ি তৈরি করে দেন তিনি। যোগাযোগ- বৈদ্যনাথ বসাক, মোবাইল-০১৭১৩-০০৫৬২৪, ০১৭১২-৫৪৭৬৪৩।
একই এলঅকার শ্রীকৃষ্ণ বসাক ও পার্থ বসাকের প্রতিষ্ঠান মেসার্স শ্রীকৃষ্ণ বসাক অ্যান্ড সন্স। তারা শাড়ি তৈরি করেন দেশের বিভিন্ন উৎসব ও ঋতুর সঙ্গে মানিয়ে। তাদের শাড়ি পাওয়া যায় দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ, শাড়ির প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য পোশাকের বিক্রয় কেন্দ্রে। পাইকারি বিক্রির পাশাপাশি তারাও অর্ডার দিলে পছন্দের রঙ ও নকশার শাড়ি তৈরি করে দেন। সুতি, সিল্কসহ সব ধরনের তাঁেতর শাড়িই তারা বুনেন। যোগাযোগ- শ্রীকৃষ্ণ বসাক ও পার্থ বসাক, মোবাইল-০১৭১১-৫৪৮২৫৫।
টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ৭ কিরোমিটার দক্ষিণে দেলদুয়ার রোডে পাথরাইলের তাঁতী রাধেশ্যাম নীলকমল বসাক তাঁতের শাড়ির অন্যতম নকশাকার ও বিক্রেতা। তিনি শাড়ির নকশা করেন বাংলাদেশের সব ধরনের উৎসব ও ঋতু কেন্দ্রীক। সুতি, সিল্ক, র-সিল্ক, হাফ সিল্ক, গ্যাস সিল্কসহ সব ধরনের শাড়িই তার কাছে পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজ, শাড়ির প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য পোশাকের বিক্রয় কেন্দ্রে নীলকমল বসাকের শাড়ি পাওয়া যাবে। পাইকারি বিক্রির পাশাপাশি নীলকমল বসাক অর্ডার পেলেও পছন্দের রঙ ও নকশার শাড়ি তৈরি করে দেন। যোগাযোগ- রাধেশ্যাম নীলকমল বসাক, মোবাইল-০১৭১১-১৭৪৫৫৭, ০১৭১১-৫৪৮২২৯, ০১৭১৫-১৭৯৬৭০।
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করটিয়া কাপড়ের হাটটি জেলায় টাঙ্গাইল শাড়ির সবচেয়ে বড় হাট। করটিয়ার হাট মূলত বৃহস্পতিবার বসে। কিন্তু সপ্তাহের মঙ্গলবার বিকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত শাড়ির হাট বসে থাকে। এ হাটে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁতীরা তাদের উৎপাদিত শাড়ি নিয়ে আসেন। আর দেশ-বিদেশের ক্রেতা-মহাজনরাও মঙ্গলবার বিকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকালের মধ্যে কাপড় কিনে নিয়ে যান।
কালিহাতী উপজেলার বল্লা গ্রামের ’পাইলট শাড়ি’র স্বত্ত্বাধিকারী মো. ফরিদ উদ্দিন ও তারেক আহাম্মেদ বাবু, একই এলাকার ফাহিমা ডাইং অ্যান্ড উইভিং ফ্যাক্টরির মালিক মো. নিয়ামত আলী ও মো. লিয়াকত আলী জানান, তাদের শাড়ির ডিজাইন তারা নিজেরাই করেন, কখনো কখনো প্রফেশনালদের সহযোগিতা নেন। তারা জানান, অতি সাধারণ মানের একটি শাড়ি তৈরিতে খরচ হয় ৪৮০ টাকা, তারা বিক্রি করেন ৫১০টাকা। এরমধ্যে আবার পাইকারি ক্রেতারা মোট দামের উপর শতাংশ পরিমাণ টাকা কম দিয়ে থাকেন। তারা জানান, আজকাল গ্রাম-শহর সর্বত্রই থ্রি-পিস/ফোর-পিস ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় শাড়ি মার খাচ্ছে।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করেছে

 
 
 

0 Comments

You can be the first one to leave a comment.

 
 

Leave a Comment

 




 
 

 
 
 

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল
আশ্রম মার্কেট ২য় তলা, জেলা সদর রোড, বটতলা, টাঙ্গাইল-১৯০০।
ইমেইল: dristytv@gmail.com, info@dristy.tv, editor@dristy.tv
মোবাইল: +৮৮০১৭১৮-০৬৭২৬৩, +৮৮০১৬১০-৭৭৭০৫৩

shopno