আজ- ৬ই জুলাই, ২০২০ ইং, ২২শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ সোমবার  দুপুর ২:৫৭

টাঙ্গাইলে সরকারি নির্দেশ অমান্য করে এনজিও’র কিস্তি আদায় চলছে

 

দৃষ্টি নিউজ:

টাঙ্গাইলে সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে এনজিওগুলো ঋণের কিস্তি আদায়ে তৎপর হয়ে ওঠেছে। অথচ আগামি ৩০ জুন পর্যন্ত ঋণের কিস্তি আদায়ে সরকারের সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে।

এনজিওগুলোর কিস্তির টাকা আদায় নিয়ে ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে এনজিও কর্মীদের অসৌজন্যমূলক আচরণে প্রায়শই ঝগড়া-বিবাদ ঘটছে। এনজিও’র কিস্তির টাকা ঋণগ্রহীতাদের কাছে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে আর্থিক সংকট আর চরম দুর্দশাগ্রস্ত জেলার কর্মহীন, মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের ঋণগ্রহীতারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

এনজিওগুলোর মাঠকর্মীরা কিস্তি আদায়ে জোর-জবরদস্তি করছে। কিস্তি না দেওয়া পর্যন্ত সকাল-সন্ধ্যা বাড়িতে বসে থাকছে। জোড়পূর্বক ঋণ আদায় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে কিস্তি আদায়ে মাঠকর্মীরা ঋণগ্রহীতাদের সাথে বেপরোয়া আচরণ করছে।

জানা যায়, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আগামি ৩০জুন পর্যন্ত নতুন করে কাউকে ঋণ খেলাপি ঘোষণা করা যাবে না উল্লেখ করে গত ২২ মার্চ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব ক্ষদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীকে নির্দেশক্রমে জানিয়েছে।

এরপরও ওই প্রজ্ঞাপনের ভুল ব্যাখা দিয়ে কিছু এলাকায় ক্ষদ্র ঋণগ্রহীতাকে কিস্তি পরিশোধে বাধ্য করার অভিযোগ পায় অথরিটি। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য গত ২৫ মার্চ আরও একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে অথরিটি।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক অক্ষমতার কারণে ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি অপরিশোধিত থাকলেও তাদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আগামি ৩০ জুন পর্যন্ত প্রাপ্য কোনো কিস্তি বা ঋণকে বকেয়া বা খেলাপি দেখানো যাবে না।

অর্থাৎ এই সঙ্কটময় সময়ে ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ঋণগ্রহীতাদের কিস্তি পরিশোধে বাধ্য করা যাবে না। কোনো গ্রাহক স্বেচ্ছায় ঋণের কিস্তি পরিশোধে ইচ্ছুক হন, তবে সে ক্ষেত্রে তার কিস্তি গ্রহণে কোনো বাঁধা থাকবে না। একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি নতুন করে কাউকে ঋণ দিতে চায় সেটা দিতে পারবে।

ঋণগ্রহীতাদের অভিযোগ, করোনাভাইরাসের প্রভাবে চরম হুমকির মুখে পড়েছে তাদের জীবন। সংক্রমণ এড়াতে সরকারের দেয়া স্বাস্থ্যবিধির সাথে বিধিনিষেধ মেনে সংসার চালাতেই তারা হিমশিম খাচ্ছেন। এমতাবস্থায় ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে এনজিও’র কিস্তি আদায় কার্যক্রম।

সরকারি ছুটি শেষের দিন থেকে কিস্তির টাকা আদায়ের জন্য বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হানা দিচ্ছে এনজিও কর্মীরা। এছাড়া কারো কারো মোবাইলেই কিস্তি পরিশোধের জন্য চাপ প্রয়োগ করছেন তারা। এতে চরম বেকায়দায় পড়েছেন ঋণগ্রহীতারা।

সরেজমিনে টাঙ্গাইল পৌর শহরের পাঁচআনী বাজারে দেখা যায়, ঋণের কিস্তি আদায়ে ব্যস্ত এনজিও কর্মীরা। বাজারটিতে ‘প্রার্থণা’ এবং ‘যুগবাণী’ নামক এনজিও’র মাঠকর্মীরা কিস্তি ও সঞ্চয়ের টাকা উত্তোলনে ব্যস্ত রয়েছেন।

সরকারি পর্যায়ের ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশন’, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক, আশাসহ প্রতিষ্ঠিত এনজিওগুলোও দেদারছে আদায় করছে ঋণের কিস্তি ও সঞ্চয়।

বেসরকারি এনজিও ‘প্রার্থণা’র ঋণগ্রহীতা ও পাঁচআনী বাজারের চা বিক্রেতা পিন্টু বসাক বলেন, প্রতিটি এনজিওকে সরকারিভাবে জুন মাস পর্যন্ত ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলেও এনজিওগুলো তা মানছে না।

সরকারি ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরের দিন থেকে প্রতিদিন বাজারে তাদের কর্মীরা ঋণের কিস্তি ও সঞ্চয় আদায়ে আসছেন। পাঁচআনী বাজারের ‘প্রার্থণা’ নামক এনজিও থেকে করোনার আগে ৩০ হাজার টাকা ঋণ তোলেন তিনি।

সরকারি ছুটি শেষ হওয়ার পরদিন থেকে দৈনিক দেড়শ’ টাকা করে কিস্তি দিচ্ছেন তিনি। দৈনিক দেড়শ’ টাকা রোজগার করতে না পারলেও তাদের কিস্তি ঠিকই দিতে হচ্ছে। এ কারণে বেশিরভাগ সময়ই অন্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধার করে টাকা এনে কিস্তির টাকা দিতে হচ্ছে। ঋণ নিয়েছি পরিশোধ তো করবোই। তবে এখন ব্যবসা ভালো না হওয়ায় কিস্তির টাকা দিতে চরম সমস্যা হচ্ছে।

যুগবাণী নামক এনজিও’র গ্রাহক ও বাজারের ব্যবসায়ী নয়ন মিয়া বলেন, এনজিওগুলো রীতিমত কিস্তি ও সঞ্চয় আদায় করলেও তারা নতুন ঋণ দিচ্ছেনা। আবার গ্রাহকের সঞ্চয়ের টাকাও ফেরত দিতে গড়িমশি করছে।

এহেন পরিস্থিতিতে তাদের মত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা পরিচালনায় ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে।

বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আলমগীর, রতন, মানিক, ওয়াসিম, রঞ্জুসহ একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, এনজিও’র কর্মীরা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে না পেয়ে মোবাইলে ফোন দিচ্ছেন। কিস্তি না দিলে আগামিতে তাদের ঋণ দেয়া হবে না বলে ভয় দেখাচ্ছেন।

এনজিও’র ঋণ ছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসা চালানো সম্ভব না বলে ধার-দেনা করে হলেও কিস্তি দিতে হচ্ছে। এটি তাদের জন্য ভীষণ কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনজিও’র এক কর্মী বলেন, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তিনি বাজারে কিস্তি ও সঞ্চয় আদায় করছেন। তবে বর্তমানে নতুন কোন ঋণ দেয়া হচ্ছেনা।

‘প্রার্থণা’ নামক এনজিও’র নির্বাহী পরিচালক শফিকুল ইসলাম জুয়েল বলেন, মাঠে আমাদের কর্মী কাজ করলেও কিস্তি আদায় হচ্ছেনা। শুধু সঞ্চয় জমা ও ফেরত দেয়ার কাজ করছে তার মাঠকর্মীরা।

জোড়পূর্বক কিস্তি আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে এনজিও ‘আশা’র টাঙ্গাইল জেলা ব্যবস্থাপক শামীম খান বলেন, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নির্দেশনা অনুসারে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

কোন ঋণগ্রহীতা ইচ্ছাকৃতভাবে কিস্তি দিলে সেটি গ্রহণ করাসহ তার প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন ঋণও প্রদান করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, জোড়পূর্বক কিস্তি আদায়ের কোন অভিযোগ তিনি পাননি।

আগামি ৩০জুন পর্যন্ত সরকারি বিধিনিষেধ মেনে এনজিওগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করছে কিনা সে বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করেছে

 
 
 

0 Comments

You can be the first one to leave a comment.

 
 

Leave a Comment

 




 
 

 
 
 

ব্যবস্থাপনা পরিচালক : মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল
আশ্রম মার্কেট ২য় তলা, জেলা সদর রোড, বটতলা, টাঙ্গাইল-১৯০০।
ইমেইল: dristytv@gmail.com, info@dristy.tv, editor@dristy.tv
মোবাইল: +৮৮০১৭১৮-০৬৭২৬৩, +৮৮০১৬১০-৭৭৭০৫৩

shopno