আজ-বৃহস্পতিবার ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২, ৭ শাওয়াল ১৪৪৭

মঞ্চে-মনে জাগ্রত বাংলাদেশের শিল্পভাষ্য

D
Dristy TVপ্রকাশ: ২৬ মার্চ, ২০২৬ বিকেল ০৫:১০
মঞ্চে-মনে জাগ্রত বাংলাদেশের শিল্পভাষ্য

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ঘিরে বৃহস্পতিবার রাজধানীজুড়ে এক অন্যরকম সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হয়। এই আবহ যেন বিশাল নান্দনিক ক্যানভাস। সেখানে ইতিহাস, চেতনা ও আবেগ একসূত্রে গাঁথা। সংগীত, আবৃত্তি, নাট্য ও নৃত্যের বহুমাত্রিক উপস্থাপনায় শিল্পীরা তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, আত্মত্যাগের মহিমা এবং স্বাধীনতার গভীর তাৎপর্য। ছায়ানট, শিল্পকলা একাডেমি ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আয়োজনে সেই চেতনা ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

ছায়ানটে সুরে স্বাধীনতার আবেগঘন অনুরণন
ছায়ানট আয়োজিত সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ছিল এক সুসংগঠিত ও ভাবনাপ্রসূত উপস্থাপনা। এ আয়োজনে প্রতিটি পরিবেশনা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি করেছে একটি ধারাবাহিক শিল্পবয়ান। সন্ধ্যার শুরুতেই সম্মেলক কণ্ঠে ‘বলো বলো রে বলো সবে’ গানটি যেন পুরো আয়োজনের আবহ নির্ধারণ করে দেয়।

এরপর একে একে মঞ্চে উঠে আসে একক সংগীত, আবৃত্তি ও নাট্যাংশ। জীবনানন্দ দাশের ‘বাংলার মুখ’ এবং সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ আবৃত্তি করা হয়। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ কিংবা নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা উলঙ্গ কিশোর’ কবিতা একাত্তরের নির্মম বাস্তবতাকে জীবন্ত করে তোলে।

সঙ্গীতানুষ্ঠান পর্বে ‘জন্ম আমার ধন্য হলো’, ‘এই বাংলার মাটিতে’, ‘এ দেশ আমার চোখের আলোয়’, ‘ও আমার বাংলা মা তোর’ দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করা হয়। নাট্যাংশে সৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ থেকে পাঠ অনুষ্ঠানকে দেয় নাটকীয় ও চিন্তাশীল মাত্রা। পাশাপাশি গদ্যাংশ, দলীয় আবৃত্তি ও সম্মেলক সংগীত পুরো আয়োজনকে পরিণত করে এক সম্মিলিত সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিতে। শেষে ‘চলছে মিছিল চলবে মিছিল’ গানটির মাধ্যমে যেন স্বাধীনতার সংগ্রামকে চিরন্তন ধারাবাহিকতার রূপ দেওয়া হয়।

26-marc_1774544151.jpg

শিল্পকলায় ভাবনা ও বিনোদনের সৃজনশীল সংলাপ
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন পায় এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও শৈল্পিক মাত্রা। আলোচনা পর্বে স্বাধীনতার ইতিহাস, নেতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ‘দ্য পিপলস প্রেসিডেন্ট’ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয় বাঙালির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের অধ্যায়। পরে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সমবেত সংগীতে দেশপ্রেমের আবেগ ছড়িয়ে পড়ে মিলনায়তনে। একক সংগীতে খুরশিদ আলম, আলম আরা মিনু, মনির খান, ফেরদৌস আরাসহ শিল্পীরা তাদের পরিবেশনায় দর্শকদের মুগ্ধ করেন।

নৃত্য পরিবেশনায় দলগত সমন্বয়, কোরিওগ্রাফির নান্দনিকতা এবং আবেগঘন উপস্থাপনা স্বাধীনতার গল্পকে দৃশ্যমান করে তোলে। ‘কালারস অব হিল’ দলের পরিবেশনা ও বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টসের শিল্পীদের নৃত্য দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।

শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, মহান স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ইতিহাসের সত্য অনুসন্ধানের মাধ্যমেই একটি জাতি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পায়। মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী সব বীরকে।

বাংলাদেশের গৌরবময় সংস্কৃতি নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, একটি জাতির প্রাণ হলো তার সংস্কৃতি। আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে আবারও পুনর্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। গ্রাম-বাংলার লোকজ শিল্প থেকে শুরু করে জীবনমুখী প্রতিটি শাখায় শুদ্ধ চর্চা ফিরিয়ে আনা হবে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রাণের উচ্ছাস
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আয়োজনে দিনের সূচনা হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে। সকালের শিশু-কিশোরভিত্তিক অনুষ্ঠানগুলো ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

এসওএস শিশু পল্লী, মুকুল ফৌজ, আনন্দলোক সাংস্কৃতিক একাডেমি ও অন্যান্য সংগঠনের অংশগ্রহণে শিশুদের পরিবেশনা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত, শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক। তাদের কণ্ঠ, অভিনয় ও নৃত্যে ফুটে ওঠে স্বাধীনতার গল্প, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে সহজভাবে পৌঁছে দেয়।

স্বাধীনতা দিবসের সন্ধ্যা নামে মানিক মিয়া এভিনিউতে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক আয়োজনের ভিন্ন আবহের মধ্য দিয়ে। খোলা আকাশের নিচে হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনীর অর্কেস্ট্রা দল এবং ব্যান্ডদল ওয়ারফেজের সংগীত পরিবেশনা এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাদের পরিবেশনায় আধুনিক সংগীতের ছোঁয়ায় দেশাত্মবোধ নতুন মাত্রা পায়।