“আদর্শের লড়াই হয় বুদ্ধিবৃত্তিক”

:: মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল ::
সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনের ইতিহাসে আজ আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় শক্তির সংজ্ঞায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। পেশিবল কিংবা মারণাস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে আজ আর কোনো জনপদকে দীর্ঘস্থায়ী শাসন করা সম্ভব নয়। ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখেছি, আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে চেঙ্গিস খান পর্যন্ত- সবাই তলোয়ারের মাধ্যমে ভূমি জয় করেছিলেন, কিন্তু মানুষের হৃদয় ও চেতনা জয় করতে পারেননি। এখানেই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের অপরিহার্যতা সামনে আসে। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘কলম তলোয়ারের চেয়ে শক্তিশালী’। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এই উক্তিটি কেবল আলঙ্কারিক নয় বরং এক কঠোর ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আদর্শের লড়াইটা আর ময়দানে নয় বরং হয়ে উঠেছে গভীরতর বুদ্ধিবৃত্তিক। একটি আদর্শ তখনই সমাজ ও রাষ্ট্রে শিকড় গেড়ে বসে, যখন তা যুক্তির নিক্তিতে উত্তীর্ণ হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক এই লড়াইয়ের মূল হাতিয়ার হলো জ্ঞান, তথ্য এবং বিশ্লেষণ।
বর্তমান বিশ্বে আমরা দেখছি ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম শক্তির জয়জয়কার। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নাই এই ধারণার প্রবর্তক। তার মতে, একটি রাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নয় বরং তার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আদর্শ এবং পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে অন্য দেশের মন জয় করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, গত এক দশকে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের মোট বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় করছে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রসারে। ইউনেস্কোর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের জিডিপির প্রায় ২.৫% থেকে ৪.৫% পর্যন্ত গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে ব্যয় করে। এটি প্রমাণ করে তারা জানে, আগামির বিশ্ব শাসন করবে তারাই, যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত মজবুত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও আদর্শিক সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। আমরা প্রায়ই দেখি, রাজপথে স্লোগান আর পাল্টাপাল্টি হুঙ্কার দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এতে সাময়িক বিজয় এলেও দীর্ঘমেয়াদী কোনো আদর্শিক পরিবর্তন আসে না।
আদর্শের লড়াই হওয়া উচিত টেবিল-টক, সেমিনার, পত্রিকার সম্পাদকীয় কলাম এবং সুস্থ বিতর্কের মাধ্যমে। যখন একটি গোষ্ঠী কেবল পেশিশক্তির ওপর নির্ভর করে তাদের মতবাদ চাপিয়ে দিতে চায়, তখন সমাজে অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থা জন্ম নেয়। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অভাব রয়েছে এবং যেখানে মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ, সেখানেই চরমপন্থা সবচেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়েছে। অর্থাৎ, তলোয়ার দিয়ে নয়, ভুল আদর্শকে মোকাবিলা করতে হয় সঠিক যুক্তি ও উন্নততর আদর্শ দিয়ে। একটি আদর্শের জয়যাত্রা অনেকটা প্রবহমান নদীর মতো। নদী যেমন তার চলার পথে পাহাড়-পাথরকে সরিয়ে দেয় না বরং নিজের গতিপথ তৈরি করে নেয়, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইও ঠিক তেমনি। এখানে প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নির্মূল করার চেয়ে তার চিন্তাধারাকে যুক্তির মাধ্যমে ভুল প্রমাণ করাটাই আসল বিজয়।
ইমাম গাজ্জালি থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্স কিংবা গ্রামশি- সবার দর্শনেই আমরা দেখি, তারা তাদের সমসাময়িক ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। আন্তোনিও গ্রামশি তার ‘হেজেমনি’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, শাসক গোষ্ঠী কেবল পুলিশ বা সেনাবাহিনী দিয়ে শাসন করে না বরং তারা শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে জনমানুষের ওপর এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য কায়েম করে। তাই যারা বিকল্প আদর্শের কথা বলেন, তাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো একটি সবল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতি-কাঠামো গড়ে তোলা। আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের নতুন ক্ষেত্র হলো ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ ও ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’। স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ বিলিয়নের বেশি মানুষ ইন্টারনেটে সক্রিয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সামনে তথ্য ও অপতথ্যের এক মহাসমুদ্র। এখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি টুইট এবং প্রতিটি লেখা এক একটি আদর্শিক লড়াইয়ের অংশ। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে যুক্তির চেয়ে আবেগ এবং সত্যের চেয়ে মিথ্যার প্রচার অনেক দ্রুত ঘটছে। এমআইটি-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সত্য খবরের তুলনায় ভুয়া খবর ৬ গুণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিকূল পরিবেশে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াকুদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। কেবল আবেগ দিয়ে নয় বরং গভীর পঠন-পাঠন এবং নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি এখন আর কেবল আবেগ বা দলীয় আনুগত্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। তারা এখন ‘ডেটা-ড্রিভেন’ (Data-driven) বা তথ্যভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। এই পরিবর্তনের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের কিছু তত্ত্ব ও উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে- ১. মেরিটক্রেসি বনাম বংশপরম্পরা (তত্ত্ব: Meritocratic Leadership) বর্তমান তরুণরা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের চেয়ে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও মেধাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। যেমন: ২০২৬ সালের নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণরা কোনো নেতার পারিবারিক পরিচয়ের চেয়ে তার যোগ্যতা, বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান এবং সংকটকালীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে বেশি বিতর্ক করছে। তারা ‘যোগ্যতাই শ্রেষ্ঠত্ব’- এই বুদ্ধিবৃত্তিক তত্ত্বে বিশ্বাসী।
২. পলিসি বনাম স্লোগান (তত্ত্ব: Rational Choice Theory) তরুণরা এখন ফাঁকা স্লোগানের বদলে সুনির্দিষ্ট ‘পলিসি’ বা নীতিমালার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। যেমন- কোনো রাজনৈতিক দল ‘বেকারত্ব দূর করার’ সাধারণ প্রতিশ্রুতি দিলে তরুণরা তা গ্রহণ করছে না। বরং তারা প্রশ্ন তুলছে- ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে এআই (AI) মোকাবিলায় আপনাদের রোডম্যাপ কী?’ কিংবা ‘ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কর কাঠামো কেমন হবে?’ এই যে যৌক্তিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা, এটাই হলো বুদ্ধিবৃত্তিক আদর্শের লড়াই।
৩. ডিজিটাল জননিরাপত্তা ও নৈতিকতা (তত্ত্ব: Digital Sovereignty) ২০২৬-এর তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘স্বাধীনতা’ মানে কেবল ভূখণ্ড নয় বরং তথ্যের সুরক্ষা এবং ইন্টারনেটে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। যেমন- সাইবার সিকিউরিটি আইন বা ডেটা প্রাইভেসির মতো জটিল বিষয়গুলো এখন পাড়ার চায়ের দোকানে তরুণদের আলোচনার বিষয়। যারা এই ডিজিটাল অধিকারের পক্ষে শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দিতে পারছে, তরুণ সমাজ সেই আদর্শের দিকেই ঝুঁঁকছে।
৪. জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন (তত্ত্ব: Intergenerational Justice) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষায় তরুণরা এখন আপসহীন। যেমন- কোনো বড় শিল্প প্রকল্প বা নগরায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তরুণরা বৈজ্ঞানিক তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে লড়াই করছে। তারা কেবল উন্নয়ন চায় না, ‘টেকসই উন্নয়ন’ চায়। এটি একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান যা প্রচলিত ‘উন্নয়ন মানেই ইট-পাথর’- এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তরুণদের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে রাজনীতি এখন আর শুধুমাত্র মাঠের লড়াই নয় বরং এটি ল্যাপটপের কিবোর্ড এবং যুক্তির টেবিলে স্থানান্তরিত হয়েছে। ২০২৬ সালের তরুণরা এমন এক আদর্শ খুঁজছে যা তাদের মেধা ও আধুনিক বিশ্বের চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ।
শিক্ষাব্যবস্থাকে বলা হয় আদর্শিক লড়াইয়ের সূতিকাগার। একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার পাঠ্যপুস্তক ও শ্রেণিকক্ষের আলোচনার মধ্য দিয়ে। আমরা যদি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিই, যদি তাদের সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking) করার দক্ষতা তৈরি না করি, তবে তারা কোনোদিনও সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবে না। বিশ্বের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আজ আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম কেন নেই? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের গবেষণার অভাব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যদশার মধ্যে। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় উচ্চশিক্ষায় আমাদের গবেষণার বরাদ্দ এবং মান উভয়ই উদ্বেগজনকভাবে নিচের দিকে। এই শূন্যতা যদি পূর্ণ না হয়, তবে বিজাতীয় আদর্শ বা ক্ষতিকর মতবাদ আমাদের সমাজকে খুব সহজেই গ্রাস করে নেবে। উপমা দিয়ে বললে, একটি গাছ যেমন তার শেকড় থেকে রসদ সংগ্রহ করে টিকে থাকে, আদর্শের লড়াইও তেমনি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শেকড় থেকে প্রাণশক্তি পায়। যে আদর্শের কোনো শেকড় নেই তা বর্ষার কচুরিপানার মতো ভেসে যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের জাতীয় জীবনে এক ধরনের শূন্যতা কাজ করছে। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য তথাকথিত বুদ্ধিজীবী নয় বরং প্রকৃত প্রজ্ঞাবান মানুষের প্রয়োজন। যারা কেবল ক্ষমতার তোষণ করবেন না বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের কথা বলবেন। মনে রাখতে হবে, বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যই হলো একটি জাতির সবচেয়ে বড় পরাজয়।
পরিশেষে বলা যায়, আদর্শের লড়াই কোনো ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া নয় বরং এটি একটি সৃষ্টিশীল বিবর্তন। এই লড়াইয়ে জেতার অর্থ কাউকে রক্তাক্ত করা নয় বরং মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে সেখানে জ্ঞানের আলো জ্বালানো। বর্তমানে আমরা যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তার টেকসই সমাধান কোনো সাময়িক মেরামতে নেই; আছে মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণে। পত্রিকা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা যখন কোনো একটি মত প্রকাশ করি, তখন সেটি কেবল একটি কলাম বা পোস্ট নয়, সেটি একটি আদর্শিক বীজ। এই বীজ যদি যুক্তিনির্ভর এবং জনকল্যাণমুখী হয়- তবে তা একদিন বিশাল মহীরুহে পরিণত হবে। ‘আদর্শের লড়াই হয় বুদ্ধিবৃত্তিক’- এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে যদি আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি, তবেই আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্থবহ হবে। তাই সংকীর্ণতা আর বিদ্বেষ নয়, মেধা ও যুক্তির লড়াই হোক আদর্শিক বিজয়ের হাতিয়ার। কারণ দিনশেষে ডানাভাঙা পাখির মতো ছটফট করে পেশিশক্তি, আর ঈগলের মতো আকাশে উড়ে বেড়ায় জয়ী আদর্শ। জয় হোক কলমের, জয় হোক সত্য ও সুন্দরের।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
সম্পর্কিত খবর

এলেঙ্গায় অসুস্থ গরু জবাইয়ের চেষ্টার দায়ে জরিমানা
১৮/০৫/২০২৬

নিষিদ্ধ আ’লীগের ১৩ ইউপি চেয়ারম্যান স্বপদে পুনর্বহাল
১৮/০৫/২০২৬

ঘাটাইলের ৯টি স্কুলের অংশগ্রহণে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত
১৮/০৫/২০২৬

টাঙ্গাইলে সড়ক নিরাপত্তা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত
১৭/০৫/২০২৬

ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় হাইস্কুল প্রোগ্রামিং ও কুইজ প্রতিযোগিতা
১৭/০৫/২০২৬

টাঙ্গাইলে পানিতে ডুবে সহোদর দুই ভাইয়ের মৃত্যু
১৭/০৫/২০২৬
