রবিবার ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩, ১০ সফর ১৪৪৮
DristyTV

পাসপোর্ট অফিসে দালালের রাজত্ব

সক্রিয় ২৩ সদস্যের দালাল সিন্ডিকেট

D
Dristy TVপ্রকাশ: ২৬ জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:০৮
পাসপোর্ট অফিসে দালালের রাজত্ব

মাসুদ রানা, অতিথি লেখক:

রাজধানীর পাসপোর্ট অফিসগুলোতে সরকারি সেবা যেন এখন অনেকটাই দালালনির্ভর হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ নিয়ম মেনে আবেদন করতে গিয়ে পড়ছেন দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি, হয়রানি ও নানা অজুহাতে আবেদন ফেরত যাওয়ার বিড়ম্বনায়। অন্যদিকে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে দালালের শরণাপন্ন হলেই মিলছে দ্রুত সেবা, নেই দীর্ঘ অপেক্ষা কিংবা জটিলতার ভয়। এমন বাস্তবতায় সরকারি এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট, যাদের সঙ্গে অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

সরেজমিনে রাজধানীর আগারগাঁও বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অফিসের মূল ফটক থেকে শুরু করে আশপাশের কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকান পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে দালালদের নেটওয়ার্ক। সেবাপ্রত্যাশীরা অফিসে প্রবেশের আগেই তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়ছেন। কেউ পাসপোর্ট করতে এসেছেন শুনলেই শুরু হচ্ছে দরকষাকষি। কোন ক্যাটাগরির পাসপোর্ট, কত দিনের মধ্যে প্রয়োজন এবং কত টাকা খরচ করতে রাজি, এসব তথ্য নিয়েই শুরু হয় সেবার প্যাকেজ অফার।

গত ২১ জুলাই সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে আগারগাঁও বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের মূল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চার থেকে পাঁচজন যুবককে দেখা যায়, যারা অফিসে প্রবেশ করা প্রায় প্রতিটি ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন। তাদের পরিচয় জানতে চাইলে ভেতরে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা দাবি করেন, তারা দালাল নন; আশপাশের কম্পিউটার দোকানে কাজ করেন এবং ফরম পূরণসহ বিভিন্ন কাজে সহায়তা করেন।

তবে পরিচয় গোপন রেখে একজন সেবাপ্রত্যাশী হিসেবে কথা বললে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। দুপুর ১টা ৩৮ মিনিটে রাজু নামে এক ব্যক্তি সাধারণ পাসপোর্ট করার জন্য আট থেকে নয় হাজার টাকা দাবি করেন। তিনি জানান, অতিরিক্ত এই অর্থ পরিশোধ করলে কোনো ধরনের সিরিয়ালে দাঁড়াতে হবে না। আবেদন জমা দেওয়ার পরপরই ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়া যাবে এবং আধা ঘণ্টার মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এমনকি নির্ধারিত সময়ের আগেই পাসপোর্ট হাতে পেতে চাইলে আরও অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে সেটির ব্যবস্থাও করে দেওয়া সম্ভব।

একইভাবে জীবন নামে আরেক ব্যক্তি জানান, তিনি দীর্ঘ ১২ বছর ধরে পাসপোর্ট অফিসের সামনে কাজ করছেন। সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত তিন হাজার টাকা দিলেই দ্রুত কাজ সম্পন্ন করে দেবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি। কেন অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই টাকা তাকে একা রাখতে হয় না। আনসার সদস্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অর্থ দিতে হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘আমি এ অফিসের সামনে ১২ বছর ধরে কাজ করছি। আমার কাজ খুব দ্রুত হয়। যে টাকা নিই তার বড় অংশ অফিসের বিভিন্ন স্যারদের দিতে হয়। আমাকে একবার কাজ দিয়ে দেখেন।’

সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, দালালের মাধ্যমে গেলে যে কাজ আধা ঘণ্টায় সম্পন্ন হয়, সেই একই কাজ নিয়ম মেনে করতে গেলে কখনো কখনো পুরো দিন পার হয়ে যায়। আবেদন জমা দেওয়া, ছবি তোলা, বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান এবং পাসপোর্ট সংগ্রহ, প্রতিটি ধাপেই রয়েছে দীর্ঘ লাইন ও হয়রানির অভিযোগ। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হচ্ছেন। পাসপোর্ট অফিসের আশপাশের কম্পিউটার দোকানগুলো কার্যত এখন একেকটি অনানুষ্ঠানিক পাসপোর্ট সেবা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। পাসপোর্টে নামের বানান ভুল, জন্মতারিখ সংশোধন, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যগত অসঙ্গতি কিংবা পুলিশ ভেরিফিকেশন সংক্রান্ত নানা জটিলতার সমাধান করে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন এসব দালাল। তাদের দাবি, পাসপোর্টের কোনো সমস্যাই তাদের কাছে সমস্যা নয়।

সেবাপ্রত্যাশী কামরুজ্জামান জানান, তার মামাতো ভাইয়ের পাসপোর্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও টাকা এক দালালের কাছে জমা দিয়েছিলেন। দালাল সাত দিনের মধ্যে পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৫ দিনের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি এখন পর্যন্ত পাসপোর্ট পাননি। এমনকি দালালের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় নতুন এসেছিলাম। অফিসের লম্বা লাইন দেখে দালালের মাধ্যমে আবেদন করি। এখন না পাচ্ছি দালালকে, না পাচ্ছি পাসপোর্ট।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগারগাঁও বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে অন্তত ২৩ সদস্যের একটি দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, জীবন সিকদার নামের একজনকে কেন্দ্র করেই এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়। তার সঙ্গে আরও অন্তত ২২ জন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে দালালির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও কয়েক ঘণ্টা পরই আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে দালালচক্র। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া দালালদের ছবি অফিসের সামনে টানিয়ে রাখা হলেও বাস্তবে তাতে কোনো কার্যকর পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানান, আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দালাল চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। দালালদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তারা আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। খুব শিগগিরই আরও একটি অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও তিনি জানান।

তিনি সাধারণ মানুষকে দালালের মাধ্যমে আবেদন না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সেবাগ্রহীতারা সচেতন হলে এই দালাল চক্রকে নির্মূল করা অনেক সহজ হবে।

ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, দালালদের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি চিহ্নিত কয়েকজন দালালের ছবি টানিয়ে তাদের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল নুরুল আনোয়ার বলেন, প্রতিনিয়ত দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরপরও তাদের উৎপাত পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতা ছাড়া কোনোভাবেই দালালদের পক্ষে এমন শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, পাসপোর্ট অফিসের দুর্নীতি নতুন কোনো ঘটনা নয়। শুধু ঢাকাই নয়, দেশের বিভিন্ন পাসপোর্ট অফিসে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়। বিদ্যমান পদ্ধতির কিছু দুর্বলতা ইচ্ছাকৃতভাবে রেখে দেওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে পাসপোর্ট অফিসে সেই সেবা পেতে অনেককেই এখন দালালের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, পাসপোর্ট সেবা কি সত্যিই দালালমুক্ত হয়েছে, নাকি সরকারি সেবার আড়ালে এখনো বহাল তবিয়তেই চলছে দালালতন্ত্র? রাজধানীর পাসপোর্ট অফিসগুলোতে প্রতিদিনের চিত্র বলছে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখনও অনেক পথ বাকি।