আজ-বৃহস্পতিবার ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২, ৭ শাওয়াল ১৪৪৭

‘আমাকে জানালা দিয়ে বের করে দেয়, কিন্তু মা বের হতে পারেনি’

D
Dristy TVপ্রকাশ: ২৬ মার্চ, ২০২৬ বিকেল ০৪:০৬
‘আমাকে জানালা দিয়ে বের করে দেয়, কিন্তু মা বের হতে পারেনি’

‘বাসে আমি মায়ের কোলে বসেছিলাম। বাসটি যখন নদীতে পড়ে যায়, আমাকে মা জানালা দিয়ে বাইরে বের করে দেয়। আমি সাঁতার কাটতে জানায় উপরে উঠতে পেরেছি। কিন্তু তার মা বের হতে পারেনি।’

আজ বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনায় বেঁচে ফেরা আলিফ এ তথ্য জানায়। সে রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের বড়চর বেনিনগর গ্রামের মান্নান মণ্ডলের ছেলে।

গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস পন্টুনে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় পড়ে তলিয়ে যায়। বাসটিতে ৪৩ জন যাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। গতকাল দুপুর ২টা ১০ মিনিটে যাত্রী নিয়ে কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে থেকে ছেড়ে আসে বাসটি। তাদের বেশিরভাগই ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন।

আট বছর বয়সি জানায়, বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার পর সে সাঁতরে তীরে উঠতে পেরেছিল। সে জীবিত আছে। কিন্তু বেঁচে নেই তার মা জ্যোৎস্না বেগম (৩৫)। মৃত জ্যোৎস্না বেগম রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের বড়চর বেনিনগর গ্রামের মান্নান মণ্ডলের স্ত্রী। জ্যোৎস্না বেগম ঢাকায় একটি গার্মেন্টে চাকরি করতেন। ছেলেকে নিয়ে ঢাকা যাচ্ছিলেন তিনি।

মৃত জ্যোৎস্না বেগমের মা সাহেদা বেগম জানান, তার মেয়ে ঢাকার একটি গার্মেন্টে চাকরি করতো। দুপুরে জ্যোৎস্নাকে তিনি রাজবাড়ী শহরের বড়পুল থেকে বাসে তুলে দিয়েছিলেন। বিকেলে জ্যোৎস্নার সঙ্গে তার শেষ যখন কথা হয় তখন জানিয়ে বলেছিল, ‘আম্মা বাস পদ্মায় পড়ে যাচ্ছে’। ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলেন, আমার মেয়েটা ফোনে কথা বলতে বলতে নদীর মধ্যে চলে গেল।

এ পর্যন্ত উদ্ধার ২৬ মরদেহ

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকার ওই দুর্ঘটনায় নারী শিশুসহ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহতরা হলেন- রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর লালমিয়া সড়কের মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), সজ্জনকান্দার মৃত ডা. আবদুল আলীমের মেয়ে জহুরা অন্তি (২৭), কাজী মুকুলের মেয়ে কাজী সাইফ (৩০), কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭), দাদশী রামচন্দ্রপুরের সোবাহান মণ্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬), আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮), মিজানপুর বড়চর বেনি নগরের মান্নান মণ্ডলের স্ত্রী জোস্ন্যা (৩৫), গোয়ালন্দ ছোট ভাকলার চর বারকিপাড়ার রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২), মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), কালুখালী বোয়ালিয়ার ভবানীপুরের বিল্লাল হোসেনের মেয়ে ফাইজ শাহানূর (১১), রতনদিয়া মহেন্দ্রপুর বেলগাছির আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা জেসমিন (৩০), ছেলে আব্দুর রহমান (৬), বালিয়াকান্দি পশ্চিম খালখোলার আরব খানের ছেলে (গাড়ি চালক) আরমান খান (৩১), কুষ্টিয়া মজমপুরের মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), খাগড়বাড়ীয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), খোকসা সমাজপুর ধুশুন্দুর দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩), সমসপুরের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহ শৈলকূপা থানার কাচেরকোল খন্দকবাড়িয়ার নুরুজ্জামানের মেয়ে আরমান (৭ মাস), গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়া আমতলী নোয়াধার মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুর পার্বতীপুর থানার পলাশবাড়ী মথুয়ারাই মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা (৪০), ঢাকা আশুলিয়ার বাগধুনিয়া পালপাড়ার মো. নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), রাজবাড়ীর কালুখালীর মজনু শেখের ছেলে উজ্জ্বল শেখ (৫০), একই উপজেলার মদাপুর গ্রামের আফসার শেখের ছেলে আশরাফুল (২৪) এবং বোয়ালিয়া এলাকার মৃত সানাউল্লাহর ছেলে জাহাঙ্গীর (৫৫)।

দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা সাকিব হোসেন, আব্দুল আজিজ ও দেলোয়ার হোসেন জানান, বাসটিতে নারী-শিশুসহ সমস্ত আসনে যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া ইঞ্জিন কভারে ৩ জন, চালক, হেলপার ও বেশ কয়েকজনের কোলে শিশু ছিল। পন্টুনে ওঠার আগে ৪-৫ জন যাত্রী নেমে গেলেও বাসটি নদীতে পড়ে গেলে স্থানীয়রা ৬-৭ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। এখনও অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।