সাংবাদিকতায় আজীবন সম্মাননা পেলেন শফিক রেহমান

দৃষ্টি রিপোর্ট:
বিশিষ্ট সাংবাদিক যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান বলেছেন, বাংলাদেশে যেন সহিংসতা না থাকে। মানুষ যেন একে অপরকে ভালোবাসে। সবাই যেন শান্তিপূর্ণভাবে দেশে বসবাস করতে পারে। সাংবাদিকরা এ জন্য তাদের লেখনীর মাধ্যমে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। শনিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে এবিএম মূসা-সেতারা মূসা ফাউন্ডেশনের দেয়া আজীবন সম্মাননা গ্রহণ করে শফিক রেহমান এই মন্তব্য করেন। খ্যাতিমান সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবিএম মূসার ৯৪তম ও তার স্ত্রী নারী সাংবাদিকতার অন্যতম অগ্রদূত সেতারা মূসার ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষে এই আজীবন সম্মাননা প্রদান ও স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্মারক বক্তব্য দিয়েছেন দি নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর। সভাপতিত্ব করেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ। সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নজরুল সংগীত ‘আমার আপনার চেয়ে আপন’ পরিবেশন করেন শিল্পী মৃদুলা সমাদ্দার। এরপর সাংবাদিক শফিক রেহমানের জীবনী পাঠ করেন অহনা শেখ। শফিক রেহমানকে লাল গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। এরপর তাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন মূসা দম্পতির বড় মেয়ে ও ফাউন্ডেশনের সভাপতি মরিয়ম সুলতানা মূসা। সম্মাননা স্মারক তুলে দেন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী সদস্য ও তাদের ছোট মেয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শারমিন মূসা। পরে এবিএম মূসা ও সেতারা মূসার জীবনী পাঠ করা হয়।
সম্মাননা প্রদানের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে শফিক রেহমান বলেন, ‘এবিএম মূসার সঙ্গে আমার একটা গভীর সম্পর্ক ছিল। তাকে সবাই এবিএম মূসা নামে চিনলেও তার আসল নাম আবু বকর মুস্তফা, তা অনেকের অজানা। তিনি পাকিস্তান অবজারভারে কাজ করার সময় অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত অনেক স্মৃতি আছে।’
এবিএম মূসার সঙ্গে তার শেষ দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে শফিক রেহমান বলেন, ‘তিনি শেষ পর্যন্ত সাংবাদিক হিসেবেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তিনি মৃত্যুর আগে আমাকে বলেছিলেন, তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারের স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু তা হয়তো আর হবে না।’ তিনি বলেন, “হসপিটালে তার শেষ দিনগুলোতে আমি দেখেছি তিনি একা ছিলেন। কারণ, একজন যখন সাহসী হন, তখন তিনি মাঝে মধ্যে একা হয়ে যান। ইদানীং একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় যে ‘সাহস আগে নাকি সত্য আগে’। আমি মনে করি, সাহস আগে, সত্য পরে। যেমন আবু সাঈদ যদি সাহস দেখিয়ে না দাড়াত, তবে সত্য আজ পরিচিত হতো না।”
যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, ‘সাংবাদিকদের জীবনে অনেক ক্রান্তিকাল আসে। কিন্তু সাংবাদিকদের সাহসী হতে হবে। আর নির্ভীকভাবে সত্য প্রকাশ করার জন্য সাংবাদিকদের বিকল্প আর্থিক আয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।’ নিজের দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি বলেন, জীবনের শুরুতেই তিনি এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বিকল্প ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন বলেই নির্ভীকভাবে সত্য কথা লিখতে পেরেছেন।’
বাংলাদেশে ‘ভালোবাসা দিবস’র প্রবর্তক শফিক রেহমান বলেন, ‘ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। ভালোবাসা থাকলে সহিংসতা থাকবে না।’ তিনি যায়যায়দিন পত্রিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার হাত থেকে ১৮ বছর আগে যা কেড়ে নেয়া হয়েছিল, তা হয়তো ভবিষ্যতে অন্য কেউ কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু ভালোবাসার দিন আর কেউ কেড়ে নিতে পারে না। ভালোবাসার মধ্য দিয়ে যদি আমরা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারি, তবে এই শহরে অনেক হানাহানি হবে। আমি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলব, আপনাদের লেখায় যেন ভালোবাসা ও সহযোগিতার বাণী ফুটে ওঠে।’
শফিক রেহমান বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া আমাকে একুশে পদক দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি তা গ্রহণ করিনি। কারণ, আমি চাইনি আমার সাংবাদিক সত্ত্বার ওপর কোনো দলীয় তকমা লাগুক। দীর্ঘ ২৪ বছর পর অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় এই পদকটি আমি পেয়েছি এবং সেটি আমি কোনো দলীয়ভাবে নিইনি বলে আমার নিরপেক্ষতা রক্ষিত হয়েছে।’
অনুষ্ঠানে ‘জনমুক্তি প্রয়াসী লড়াকু সাংবাদিকতা : বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে’ শীর্ষক দীর্ঘ স্মারক বক্তব্য দেন নূরুল কবীর। তিনি বলেন, এবিএম মূসা এ দেশের রাজনীতি-সচেতন সাংবাদিকতার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। কোনো রাষ্ট্র যখন তার নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যনীতি চর্চা করে, তখন সেই সমাজের সব পরিসরে তার ছায়া ও প্রভাব পড়তে বাধ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্বকালে, পাকিস্তানি রাষ্ট্র ও তার পশ্চিম ভিত্তিক শাসক শ্রেণি বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে বৈষম্য নীতি গ্রহণ ও চর্চা করেছে। এবিএম মূসা এই বিষয়টি লক্ষ করেছেন এবং সক্রিয় প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেছেন। বিভিন্ন পরিসরে এই সব ছোট-বড় প্রতিবাদ সমন্বিত রূপ ধারণ করেই বাংলাদেশের বৈষম্য বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল।
নূরুল কবীর বলেন, সাংবাদিকতা মোটেও কোনো রাজনীতি-নিরপেক্ষ নিরীহ পেশা নয়। এবিএম মূসা রাজনীতি-সচেতন ছিলেন, এমনকি নির্দিষ্ট দলীয় আনুগত্যও তার ছিল। তবে সাংবাদিকতা চর্চার পরিসরে তিনি কখনই দলান্ধ ছিলেন না। রাজনৈতিক সাংবাদিকতা ছাড়াও সাংবাদিকতার নানা পরিসরে এবিএম মূসার অবদান অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন শফিক রেহমানের স্ত্রী ও ডেমক্রেসি ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক তালেয়া রেহমান। আরো বক্তব্য দেন কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান অধ্যাপক অলিউর রহমান, ধন্যবাদ জানান ফাউন্ডেশনের কোষাধ্যক্ষ আফতাব উদ্দিন।
সূত্র: যায়যায়দিন






