আধুনিকতার আগ্রাসনে কোণঠাসা আদিবাসী কৃষ্টি
হারিয়ে যাচ্ছে গারোদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘দকমান্দা’ সুতা আর রঙের পরম মায়া শঙ্কা ও স্বপ্নের দোলাচলে নতুন প্রজন্ম মাঠের কাজেও অনন্য দকমান্দা ঐতিহ্য বাঁচানোর শেষ লড়াই

বুলবুল মল্লিক:
গারো ভাষায় ‘দক’ শব্দের অর্থ শরীর আর ‘মান্দা’ মানে কাপড় বা শাড়ি। এই দুই শব্দের যুগলবন্দী থেকে জন্ম ‘দকমান্দা’র। এটি কেবল সুতা আর রঙের বুননে তৈরি কোনো সাধারণ পোশাক নয়; এটি টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুরের শালবনের কোলে বেড়ে ওঠা গারো নারীদের আত্মপরিচয়- হাজার বছরের কৃষ্টি আর জাতিগত ঐতিহ্যের এক জীবন্ত ক্যানভাস। একসময় গারোদের সামাজিক উৎসব, বিয়ে কিংবা ওয়ানগালার আনন্দ-উচ্ছ্বাসে নারীরা একই রঙের দকমান্দা পরে হাজির হতেন। একই রঙে রাঙানো সেই উৎসবের আমেজ যেমন বাড়াত সৌহার্দ্য, তেমনি সগর্বে জানান দিত তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির উপস্থিতি। তবে কালের বিবর্তন, আধুনিকতার তীব্র স্রোত আর যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে গারোদের এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও মাতৃভাষা আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, একটি দকমান্দা তৈরি মোটেও সহজ কাজ নয়। এটি তৈরিতে প্রয়োজন হয় নিখুঁত বুননশৈলী, চরম ধৈর্য এবং দীর্ঘ সময়। গারো নারীরা সম্পূর্ণ নিজস্ব কারিগরি জ্ঞানে, কাঠের তৈরি আদি তাঁতযন্ত্রের (কোঁক) সাহায্যে ঘরে বসে এই পোশাক বোনেন। এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর পাড় বা বর্ডারের বৈচিত্র্যময় নকশা ও হরেক রঙের সুতার কাজ। বিভিন্ন ফুল, লতা-পাতা ও জ্যামিতিক নকশার বুননে ফুটিয়ে তোলা হয় পাহাড়ের প্রাকৃতিক রূপ। এক একটি আকর্ষণীয় ও ভারী নকশার দকমান্দা তৈরি করতে একজন কারিগরের এক থেকে দুই সপ্তাহ, এমনকি নকশা জটিল হলে এক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। সম্পূর্ণ হাতে বোনা এই পোশাকটি তৈরিতে যে পরিমাণ কায়িক শ্রম দিতে হয়- সেই তুলনায় এর পেছনে ব্যয়ের পরিমাণও অনেক বেশি। বর্তমানে সুতা, রঙ ও তাঁত তৈরির উপকরণের দাম বাজারে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে একটি ভালো মানের দকমান্দা তৈরিতে উৎপাদন খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি এর খুচরা বাজারমূল্যও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বর্তমানে বাজারে একটি সাধারণ মানের দকমান্দা ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও আকর্ষণীয় নকশার দামি দকমান্দাগুলো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি মূল্যে বিক্রি হয়। কিন্তুটাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল ও সখীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গারো জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই নিম্ন আয়ের হওয়ায় এই চড়া মূল্যের পোশাক নিয়মিত কেনা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে এ বস্ত্রের কারিগররা যেমন লোকসানের মুখে পড়ছেন, তেমনি আধুনিক কাপড়ের সহজলভ্যতা ও কম দামের কাছে মার খাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাকটি।
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গায়রা এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক সভ্যতার নানামুখী চাপের পরও কিছু মানুষ এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন তাদের পুরনো কৃষ্টি। প্রখর রোদে মাঠে কাজ করার সময়ও অনেক গারো নারী অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে এক প্যাঁচে জড়িয়ে রেখেছেন নিজস্ব সংস্কৃতির এই দকমান্দা।
সেখানেই কথা হয় গায়রা এলাকার গারো কিশোরী বাপ্পি বেডুলকারের সাথে। বাপ্পির চোখেমুখ জুড়ে তার সম্প্রদায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। তার কাছে এই দকমান্দা কেবল শরীর ঢাকার আবরণ নয় বরং তার সম্প্রদায়ের পরিচয়, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক পরম প্রতীক।

বাপ্পি ও তার সমবয়সী কিশোরীরা আক্ষেপ করে জানান, আধুনিকতার আগ্রাসনে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও তাদের মাতৃভাষা ধীরে ধীরে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তারা বলেন, ‘দকমান্দা আমাদের ঐতিহ্যের পোশাক। এটি এক প্যাঁচে পরতে হয়। ছোটবেলা থেকেই মা-বানিদের (নানি-দাদি) দেখে আমরা এটি পরা শিখেছি। এটি পরতে আমাদের ভীষণ ভালো লাগে।’ কাজের ক্ষেত্রে এই পোশাকের উপযোগিতা বর্ণনা করে তারা আরও বলেন, ‘পোশাকটি শরীরের সাথে এমনভাবে মিশে ও মানিয়ে যায় যে মাঠের কঠিন কাজ বা ঘরের দৈনন্দিন কাজ করতে কোনো রকম অসুবিধা হয় না। ভাড়ি কোনো পোশাক পরে আছেন- এমন অস্বস্তি কখনোই তৈরি হয় না। তবে এই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য টিকে থাকার পথটি এখন আর মসৃণ নেই। বর্তমান যুগের তরুণ-তরুণীদের একাংশের অনীহা এবং বাইরের সমাজের অবহেলামূলক দৃষ্টিভঙ্গি একে কোণঠাসা করে ফেলছে।
কিশোরীরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানান, এখন অনেকেই এটি আর নিয়মিত পরতে চান না। এই পোশাক পরে বাইরে বা শহরে গেলে আমাদের নানা ধরণের আপত্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। অনেকে আমাদের দিকে আলাদা চোখে তাকায়। এর সাথে যোগ হয়েছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা। অর্থাভাবের কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক গারো কিশোরী বা নারী এখন আর মনের মতো সুন্দর বা দামি দকমান্দা কিনে পরতে পারেন না।
মধুপুরের গারো সম্প্রদায়ের সদস্য অঞ্জনা নকরেক জানান, দকমান্দার নকশা ও রঙে পাহাড়ি প্রকৃতি এবং গারো সংস্কৃতির ছাপ ফুটে ওঠে। জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিনটিতে তারা আধুনিক কোনো পশ্চিমা বা ভিনদেশি পোশাক নয় বরং পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া অনন্য সুন্দর একটি দকমান্দা পরেই কনে সাজবেন, বসবেন বিয়ের পিঁড়িতে। আধুনিকতার ঝড়ো হাওয়ায় গারো সংস্কৃতির এই অমূল্য সম্পদ পরম মমতা আর ভালোবাসাই এখনো টিকিয়ে রেখেছে শত বছরের এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে।
মধুপুরের আচিক মিচিক সোসাইটির পরিচালক সুলেখা ম্রং জানান, গারো সমাজে দকমান্দা শুধু পোশাক নয়, এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম বাহন। তবে সময়ের পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের কারণে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এবং মূলধারার সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ব্যবহার কমছে। তবু তিনি বিশ্বাস করেন, ভাষা ও পোশাকই গারো সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয়। তাই দকমান্দা টিকিয়ে রাখা মানে নিজেদের শিকড় ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা।
ঠিকানা: জেলা সদর রোড, বটতলা, টাঙ্গাইল-১৯০০
ইমেইল: dristytvnews@gmail.com
সম্পর্কিত খবর

টাঙ্গাইলের দেয়ালে দেয়ালে ‘চাঁনু পাগলা’র ভালোবাসার ক্যানভাস!
১৯/০৬/২০২৬

শিল্পকলায় ৮ দিনের নাট্য উৎসব শুরু
১২/০৬/২০২৬

ভাসানী হল সংস্কারের মাধ্যমে ‘মডেল টাঙ্গাইল’ গড়া হবে :: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী
১২/০৬/২০২৬

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তিন মাসের জন্য প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
৩১/০৫/২০২৬

নাগরপুরে নববর্ষ বরণে বৈশাখী শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত
১৪/০৪/২০২৬

গোপালপুরের গোয়ালবাড়ী খাল তিন দশক পর পুনঃখননের উদ্বোধন
১২/০৪/২০২৬
