টাঙ্গাইলে উচ্চ প্রোটিনের ‘সুপার ব্যানানা’ আবিষ্কার

দৃষ্টি রিপোর্ট:
টাঙ্গাইলের কুরতুবী মাদরাসার আলিম শাখার ছাত্রীরা উচ্চ প্রোটিনের ‘সুপার ব্যানানা’ আবিষ্কার করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। তারা মুসুর ডালের জিনে দিয়ে তৈরি করেছে উচ্চ প্রোটিনের ‘সুপার ব্যানানা’। তাদের এ আবিষ্কারের স্বীকৃতিও মিলেছে। চলতি বছরের জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহের মেলায় টাঙ্গাইল সদর উপজেলা ও টাঙ্গাইল জেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে। ঢাকা বিভাগীয় জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করে। সেখানে পুরষ্কৃত না হলেও বিচারক থেকে শুরু করে আমন্ত্রিতদের ভুয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে।
‘সুপার ব্যানানা’ হচ্ছে- একটি কলা যা উৎপাদনের মাধ্যমে স্বাদ অপরিবর্তিত রেখে কলাকে অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ করা যাবে। এটি অপুষ্টি দূরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। এ প্রযুক্তি আবিষ্কারক দলের ছাত্রীরা হচ্ছেন- মাদরাসার প্রথম বর্ষের ফাতেমাতুজ জহুরা, অনামিকা আলফি আমরি, মিফতাহুল জান্নাত মায়া, মেঘলা আক্তার ও ফারজানা আক্তার।
উদ্ভাবক দলের দলনেত্রী ফাতেমাতুজ জহুরা জানান, এই প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ হচ্ছে- কলার ডিএনএ নিষ্কাশন করা এবং রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রোটিন সমৃদ্ধ কলার একটি মডেল তৈরি করা। এ প্রজেক্টে মুসুর ডাল থেকে ডিএইচডিপিএস জিন নির্বাচন করা হয়েছে- যা লাইসিন সমৃদ্ধ প্রোটিন উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
লাইসিন একটি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড যা মানবদেহের বৃদ্ধি, টিস্যু গঠন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণ কলায় লাইসিনের পরিমাণ কম থাকায় জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এর পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
গবেষক ছাত্রীরা জানান, চলতি বছরের মার্চ মাসে তারা জীববিজ্ঞান ল্যাব ক্লাসে ডিএনএ প্রযুক্তি নিয়ে তারা কাজ করছিলেন। এ সময় হঠাৎ করেই তাদের মাথায় আসে নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের ধারণা। কোন চিন্তা-ভাবনা না করে শুরু করে দেন গবেষণা। তাদের গাইড শিক্ষক আরিফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে চলতে থাকে গবেষণা। প্রবল আগ্রহ ও কঠোর সাধনা শুরু হয়। তাদের সময়ের বড় অংশ কাটতে থাকে ল্যাবে-গবেষণার কাজে। মাত্র এক মাসের মাথায়ই তারা সাফল্যের দেখা পান। উদ্ভাবন করেন-স্বাদ অপরিবর্তিত রেখে কলাকে অধিক প্রোটিন সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তারা এ প্রজেক্টের নাম দেন, ‘প্রোটিন সমৃদ্ধ কলা তৈরির জন্য কলার ডিএনএ নিষ্কাশন ও রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ মডেল’।
চলতি বছরের ৮ ও ৯ এপ্রিল টাঙ্গাইল সদর উপজেলা জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে উপজেলা পর্যায়ে কুরতুবী আলিম মাদরাসার ছাত্রীদেরা নতুন উদ্ভাবন প্রথম স্থান অর্জন করে। একই মাসের ১৬, ১৭ ও ১৮ এপ্রিল জেলা জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে। এরপর বিভাগীয় পর্যায়ে গিয়ে দ্বিতীয় হয়ে অংশগ্রহণ করে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলায়। জাতীয় পর্যায়ে পুরষ্কৃত হতে না পারলেও প্রশংসিত হয়েছে এ আবিষ্কার।
কুরতুবী আলিম মাদরাসার ছাত্রীরা জানায়, কলা পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত ফল। এটি শক্তি, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের ভালো উৎস হলেও এতে কিছু অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড, বিশেষ করে লাইসিনের পরিমাণ কম থাকে। আধুনিক জৈবপ্রযুক্তি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ফসলের পুষ্টিমান বৃদ্ধি করা সম্ভব। রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক জীবের উপকারী জিন অন্য জীবের মধ্যে প্রবেশ করানো যায়। এই প্রজেক্টে কলার ডিএনএ নিষ্কাশনের পাশাপাশি মুসুর ডালের ডিএইচডিপিএস জিন কলার মধ্যে সংযুক্ত করার একটি তাত্ত্বিক মডেল তৈরি করা হয়েছে- যার মাধ্যমে লাইসিন সমৃদ্ধ ও অধিক পুষ্টিকর কলা উৎপাদনের ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রজেক্টের উদ্দেশ সম্পর্কে ছাত্রীরা জানায়- কলার ডিএনএ নিষ্কাশন করা, রিকম্বিন্যান্ট ডিএনএ প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা, মুসুর ডালের ডিএইচডিপিএস জিন কলার ডিএনএ-তে সংযুক্ত করার মডেল তৈরি করা, লাইসিন সমৃদ্ধ ও প্রোটিনযুক্ত কলা উৎপাদনের ধারণা প্রদান করা, কলার স্বাদ ও গুণগত মান অপরিবর্তিত রাখা, অপুষ্টি দূরীকরণে জৈবপ্রযুক্তির ভূমিকা তুলে ধরা এবং কৃষি ও অর্থনীতিতে জেনেটিক পরিবর্তিত ফসলের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা।
এ প্রযুক্তি আবিষ্কারের জন্য তারা কিছু উপকরণ বেছে নিয়েছেন। তারা মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- পাকা কলা, লবণ, গরম পানি, ডিশ ওয়াশিং লিকুইড, ব্লেন্ডার/চামচ, কফি ফিল্টার বা পাতলা কাপড়, টেস্ট টিউব/গ্লাস, ঠান্ডা অ্যালকোহল বা ইথানল এবং কাঠি বা টুথপিক।
ছাত্রীরা জানায়, বাণিজ্যিকভাবে প্রোটিন সমৃদ্ধ কলা উৎপাদন, অন্যান্য ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ ফসল তৈরি, বৃহৎ পরিসরে গবেষণা ও চাষাবাদ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জৈবপ্রযুক্তি গবেষণায় অংশগ্রহণ করা আবিষ্কৃত প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তবে এজন্য তাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এজন্য তাদের উন্নত ল্যাব সুবিধা প্রয়োজন। জেনেটিক পরিবর্তিত খাদ্য নিয়ে সামাজিক ও নৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে। বাণিজ্যিক ব্যবহারের আগে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন বলে তারা উল্লেখ করেন।
ছাত্রীদের আবিষ্কারের গাইড শিক্ষক আরিফুল ইসলাম জানান, শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহ অনেক বেশি। ওদের একটু ধারণা দেওয়া হলে ওরা ভালো কিছু করতে পারবে। ছাত্রীরা দেখিয়েছে, জিন ট্রান্সফারের মাধ্যমে কিভাবে অত্যাবশকীয় এমাইনো এসিড সমৃদ্ধ প্রোটিন উৎপাদন করা যায়।
কুরতুবী আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ মো. রেজাউল করিম জানান, দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞানমনস্ক, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতেও বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে- যাতে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় দেশ ও জাতির কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
টাঙ্গাইলের কুরতুবী মাদরাসার চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ খান জানান, এই উদ্ভাবন দেশের জন্য উজ্জ্বল ভূমিকা রাখবে। এই সাফল্য তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের দুয়ারে খুব সহজেই প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।
ঠিকানা: জেলা সদর রোড, বটতলা, টাঙ্গাইল-১৯০০
ইমেইল: dristytvnews@gmail.com
সম্পর্কিত খবর

টাঙ্গাইলে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত
২০/০৬/২০২৬

মধুপুরে দুই দিনব্যাপী বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধন
১১/০৪/২০২৬

গাজীপুরে গ্রামীণফোন গ্রাহকদের বিশেষ আয়োজন
০৯/০৪/২০২৬

তিনদিন ইন্টারনেট সেবা বিঘ্ন ঘটতে পারে
০৮/০৪/২০২৬

ফোনে গোপন নজরদারি চালাচ্ছে যেসব অ্যাপ
০৬/০৪/২০২৬

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি মানবকল্যাণেরও অন্যতম ভিত্তি :: প্রযুক্তি মন্ত্রী
০৪/০৪/২০২৬
