স্মৃতির ক্যানভাসে বিস্মৃতির দাগ

D
Dristy TV
ঢাকা প্রকাশিত: ৩ ঘণ্টা আগে
স্মৃতির ক্যানভাসে বিস্মৃতির দাগ

:: মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল ::

বাঙালির জাতিগত মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তার বিস্মৃতিপ্রবণতা। তীব্র আবেগ এবং দ্রুত সবকিছু ভুলে যাওয়ার এক আত্মঘাতী মানসিকতা এই জনপদের মানুষের মজ্জাগত। ফরাসি দার্শনিক আর্নেস্ট রেনান তাঁর বিখ্যাত ‘হোয়াট ইজ এ নেশন?’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘জাতি গঠনে যেমন যৌথ স্মৃতি প্রয়োজন, তেমনি অনেক কিছু ভুলে যাওয়াও দরকার।’ কিন্তু বাঙালির ক্ষেত্রে এই ‘ভুলে যাওয়া’ কোনো দার্শনিক প্রয়োজন নয় বরং এক রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাধি। যে জাতি রক্তের নদী পেরিয়ে তার অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষা করে, সেই জাতিই কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই রক্তের ঋণ এবং ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা বিস্মৃত হয়। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকবদলে বাঙালির এই বিস্মৃতির ধরণ এবং তার চড়া মূল্য দেওয়ার খতিয়ান বিশ্লেষণ করা বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এক অতীব জরুরি বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণাধর্মী তাগিদ।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের আত্মত্যাগ বাঙালিকে একটি নতুন ধর্মনিরপেক্ষ জাতিসত্তার পরিচয় দেয়। এই আন্দোলন শুধু ভাষার ছিল না, এটি ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম তীব্র সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আঘাত। ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষার অধিকার ঠিকই আদায় করেছিল, কিন্তু তার মূল চেতনা ধরে রাখতে পারেনি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর যে আইনি ও নৈতিক অঙ্গীকার ছিল, তা আজ দীর্ঘ সাত দশকেও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের উচ্চ আদালত, উচ্চশিক্ষা এবং করপোরেট ও প্রশাসনিক স্তরে বাংলা ভাষার পদাঙ্ক নিশ্চিত করা যায়নি। একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা যে তীব্র আবেগ দেখাই, বছরের বাকি ৩৬৪ দিন তা ইংরেজি বা ভিনদেশি ভাষার আগ্রাসনে হারিয়ে যায়। ভাষা আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ভুলে গিয়ে সমাজ বারবার মৌলবাদ ও সংকীর্ণতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ছাত্র সমাজের ১১ দফার ভিত্তিতে সংঘটিত হয় এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান। আসাদ, ডক্টর শামসুজ্জোহা, মতিউরের আত্মত্যাগের মুখে আইয়ুব খানের লৌহকঠিন সামরিক জান্তা পতন ঘটাতে বাধ্য হয় এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু সসম্মানে মুক্তি পান। এই আন্দোলন বাঙালিকে শিখিয়েছিল কীভাবে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে স্বৈরাচারকে বিদায় করতে হয়। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছিল নাগরিক অধিকার ও ফ্যাসিবাদের প্রশ্নে আপসহীন হতে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা দ্রুতই ভুলে যাই আইয়ুবীয় স্টাইলের স্বৈরাচারী ব্যবস্থার কুফল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্রেও বারবার সামরিক শাসন বা বেসামরিক একনায়কতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। যে ছাত্র সমাজ ও জনতা স্বৈরাচারের তখত উল্টে দিয়েছিল, ক্ষমতার পালাবদলের পর তারাই আবার নতুন কোনো শাসকের অন্ধ ভক্তে পরিণত হয়েছে। স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইয়ের মূল মন্ত্র- ‘গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ বাঙালি বারবার ভুলে গেছে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে শুরু হওয়া গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালি সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং কোটি মানুষের ঘরবাড়ি হারানোর মধ্য দিয়ে এই স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি ছিল তিনটি- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় নিয়ে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। স্বাধীনতার পর বাঙালির ভুলে যাওয়ার অভ্যাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও বীভৎস বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। যে জাতি কিছুদিন আগেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়েছিল, তারা এক অদ্ভুত জড়তা, উদাসীনতা ও বিস্মৃতির শিকার হলো। এরপর শুরু হলো ইতিহাসের উল্টোরথ যাত্রা। মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নিত ঘাতক-দালাল, রাজাকার ও আলবদরদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পুনর্বাসিত করা হলো; তাদের গাড়িতে ওড়ানো হলো লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত লাল-সবুজ পতাকা। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ঢেকে তরুণ প্রজন্মকে রাখা হলো সত্য থেকে দূরে। সবচেয়ে বড় বিস্মৃতি ঘটল মুক্তিযুদ্ধের মূল আকাক্সক্ষায়- সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাষ্ট্রে এক চরম ক্রনি-ক্যাপিটালিজম বা লুণ্ঠনমূলক অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করা হলো।

নয় বছরের সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদ সরকারের পতনের লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে গড়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট এবং বামপন্থীদের ৫ দলীয় জোট মিলে ঘোষণা করে ‘তিন জোটের রূপরেখা’। এই রূপরেখার মূল ভিত্তি ছিল- অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, স্বৈরাচারী ও কালো আইন বাতিল এবং টেকসই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা। নূর হোসেন, ডা. মিলনের রক্তের বিনিময়ে ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারের পতন ঘটে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর তিন জোটের সেই ঐতিহাসিক রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ক্ষমতার চেয়ারে বসার পরপরই দলগুলো আবার পরমতসহিষ্ণুতা ভুলে গিয়ে পারস্পরিক প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করে। সংসদকে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে চলে একের পর এক সংসদ বয়কট ও রাজপথের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি। রূপরেখায় যে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা রূপ নেয় দলীয়করণ, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র এবং বিচার বিভাগের টুঁটি চেপে ধরার খেলায়। বাঙালি ভুলে গেল যে, গণতন্ত্র কেবল পাঁচ বছর পর পর ভোট দেওয়ার উৎসব নয়, এটি একটি নিত্যদিনের চর্চা ও সংস্কৃতির নাম।

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা একচ্ছত্র কর্তৃত্ববাদী শাসন, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, গুম-খুন, তীব্র অর্থনৈতিক লুণ্ঠন, মেগা প্রজেক্টের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে দেশে এক চরম ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছিল। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গর্জে ওঠে দেশের ছাত্র-জনতা। কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া এই সংগ্রাম সরকারি বাহিনীর নজিরবিহীন ও নৃশংস দমনপীড়নের মুখে রূপ নেয় এক দফার গণঅভ্যুত্থানে। আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, ওয়াসিমসহ শত শত শহীদের আত্মত্যাগ এবং হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ছাত্র-জনতার এই নজিরবিহীন বিজয়কে অভিহিত করা হয় ‘চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে। এই আন্দোলন রাষ্ট্র মেরামতের এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট দেয়।

বাঙালির ভুলে যাওয়ার সহজাত অভ্যাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন চলছে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি ফ্যাসিবাদের স্থায়ী অবসান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল সংস্কার। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আন্দোলনের রক্ত শুকানোর আগেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিষাক্ত লক্ষণগুলো আবার দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয়করণ এবং ভিন্নমতের ওপর চড়াও হওয়ার প্রবণতা সমাজ থেকে পুরোপুরি দূর করা যায়নি। যে তরুণরা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে নতুন পথ দেখাল, তাদের সেই পবিত্র আত্মত্যাগকে ভুলে গিয়ে সমাজ যদি আবার দলীয় সংকীর্ণতা, সুবিধাবাদ ও মেরুকরণের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়, তবে এই গণঅভ্যুত্থানের অর্জনও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। পূর্বসূরিদের মতো চব্বিশের প্রজন্মও যদি ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যায়, তবে তা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও বেদনাদায়ক বিস্মৃতি।

ইতিহাসের খতিয়ান ঘাঁটলে দেখা যায়, বাঙালি লড়তে জানে, বুক পেতে রক্ত দিতে জানে, কিন্তু অর্জিত বিজয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ধরে রাখতে জানে না। এর প্রধান কারণ- আমরা ইতিহাসের আবেগকে সস্তা স্লোগানে রূপান্তর করি, কিন্তু তার গভীর শিক্ষাকে ধারণ করি না। বিজয়ের পর আমরা এক ধরনের সাময়িক আত্মতুষ্টিতে ভুগি এবং দ্রুতই সব ভুলে গিয়ে আবার পুরোনো ভুলের ফাঁদে পা দিই। যদি আমরা ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে আগের আন্দোলনগুলোর মতো বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে দিতে না চাই, তবে আমাদের এই ‘সহজাত ভুলে যাওয়ার রোগ’ থেকে চিরতরে মুক্ত হতে হবে। প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকবদলের শহীদদের স্মৃতি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায়, স্মৃতিসৌধে বা নামফলকে বন্দী না রেখে- তাদের মূল আকাক্সক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতি, সংবিধান ও নাগরিক জীবনে প্রতিফলিত করতে হবে। বাঙালিকে ‘স্মৃতিভুক’ জাতি হওয়া বন্ধ করতে হবে; কারণ যে জাতি বারবার ইতিহাস ভুলে যায়, ইতিহাস তাকে বারবার স্বৈরাচারের শৃঙ্খলে বন্দী করে শাস্তি দেয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

একই বিষয়ের আরও খবর