সম্পাদকীয়
বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকল্পনাই মুক্তির দূত
:: মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল ::২০২৬ সালের বিশ্ব রাজনীতি ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চালচিত্র এক গভীর ও অভূতপূর্ব রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের তীব্র প্রভাব প্রমাণ করেছে সনাতন ধারার আবেগসর্বস্ব ও স্লোগানভিত্তিক রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ কার্যকারিতা হারিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, জলবায়ু বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক নব্য-বাস্তবতার এই যুগে বাংলাদেশের টিকে থাকা এবং এগিয়ে যাওয়া নির্ভর করছে সম্পূর্ণ নতুন এক রাজনৈতিক দর্শনের ওপর। বর্তমান বাস্তবতায় আবেগ নয় বরং বিজ্ঞানমনস্ক, দূরদর্শী এবং গবেষণানির্ভর ‘বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকল্পনা’-ই সংকটের গোলকধাঁধা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। বিশ্ব রাজনীতিতে এখন চলছে তীব্র মেরুকরণ। পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত যুদ্ধ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক প্রভাবের বাইরে নয়। এই অবস্থায় কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করা অসম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন গভীর কৌশলগত বিশ্লেষণ, দক্ষ কূটনীতি এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি নির্ধারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হলে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াতে হলে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে গবেষণালব্ধ। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আমাদের প্রচলিত কর্মসংস্থান কাঠামোকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সনাতন শ্রমশক্তির ওপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার দিন শেষ। এখন প্রয়োজন মেধা-ভিত্তিক অর্থনীতি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে জাতি হিসেবে আমরা এক বিশাল বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার মুখে পড়ব। বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকল্পনা এখানে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কারিগরি দক্ষতার উন্নয়ন এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কৌশল তৈরিতে পথ দেখাবে। তদুপরি, মহামারী-উত্তর অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি আমাদের নব্য-বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে বৈদেশিক ঋণের ব্যবস্থাপনা- সব ক্ষেত্রেই আবেগতাড়িত সিদ্ধান্তের কোনো সুযোগ নেই। প্রতিটি খাতের নীতি নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের মতামতের প্রতিফলন এবং ডেটা-চালিত (data-driven) সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।চলতি ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি- আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য কেবল সামরিক শক্তিতে নয় বরং প্রযুক্তি, তথ্য ও অর্থনৈতিক কৌশলের ওপর নির্ধারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের সস্তা শ্রমের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে মেধা ও দক্ষতার ওপর জোর দিতে হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জেনারেটিভ এআই এবং রোবোটিক অটোমেশনের কারণে শ্রমবাজার দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। যে সব দেশ প্রযুক্তির এই গতিপ্রকৃতি বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে- তারা তীব্র অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়ছে। দেশের ভেতরে তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে তুঙ্গে। সমকালীন তরুণ সমাজ সস্তা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং কর্মসংস্থানের বাস্তবমুখী ও প্রায়োগিক রূপরেখা দেখতে চায়।টেকসই উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে মেধাভিত্তিক ও তথ্য-উপাত্তনির্ভর রোডম্যাপের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি চালিকাশক্তির নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে- ক) আইটি সেক্টর: চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও মেধার বিশ্বায়নে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এখন সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তিনির্ভর। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) সাম্প্রতিক সমীক্ষা ও ২০২৬ সালের বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ফলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও করপোরেট খাতের প্রায় ২৫% মধ্যম সারির চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়বে, যদি না আমরা দ্রুত দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারি। প্রতিবেশী দেশ ভারতের বেঙ্গালুরু যেখানে বার্ষিক আইটি রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করেছে, সেখানে বাংলাদেশের আইটি রপ্তানি এখনো ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের বৃত্তে আটকে আছে। দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর প্রায় ২০,০০০ আইটি গ্র্যাজুয়েট বের হলেও, বৈশ্বিক চাহিদার সাথে কারিকুলামের অমিলের কারণে প্রায় ৪২% গ্র্যাজুয়েট সরাসরি আন্তর্জাতিক মানের কাজ পাওয়ার যোগ্যতা হারাচ্ছেন। ২০২৬ সালের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় এজেন্ডায় এআই গভর্ন্যান্স, ডেটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি এবং সেমিকন্ডাক্টর মাইক্রোচিপ ডিজাইনে রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি। ভারতের আইআইটি (IIT) বা সিলিকন ভ্যালির আদলে বিশেষায়িত টেক-হাব তৈরি করে তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং থেকে উদ্যোক্তায় রূপান্তর করার মহাপরিকল্পনা নিতে হবে।খ) বৈদেশিক রেমিট্যান্স: বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধানতম উৎস হলো প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তবে গত কয়েক দশক ধরে অনুসৃত ‘শুধু অদক্ষ শ্রমিক’ পাঠানোর কৌশল ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাস্তবতায় সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো (যেমন- সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০) এখন মেগা সিটি, পর্যটন ও হাই-টেক প্রজেক্টের দিকে ঝুঁঁকছে, যার ফলে সেখানে সাধারণ নির্মাণ শ্রমিকের চাহিদা দ্রুত কমছে। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭ থেকে ৮ লাখ শ্রমিক কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি দিলেও তাদের প্রায় ৭৫% থেকে ৮০% সম্পূর্ণ অদক্ষ। ফলে ফিলিপাইন বা শ্রীলঙ্কার একজন দক্ষ নার্স, প্রকৌশলী বা আইটি কর্মী যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ ডলার দেশে পাঠান, সেখানে একজন বাংলাদেশি সাধারণ শ্রমিক কঠোর পরিশ্রম করেও পাঠাতে পারেন মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ ডলার। আমাদের রেমিট্যান্স নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে নার্সিং, কেয়ার-গিভিং, আধুনিক ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন কারিগরি প্রযুক্তিতে ডিপ্লোমাধারী দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করতে হবে। মেধাভিত্তিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নতুন নতুন উন্নত দেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করাই হবে আগামী দিনের রেমিট্যান্স সুরক্ষার মূল চাবিকাঠি। মুদ্দা কথা, অদক্ষ শ্রমের অবসান করে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।গ) কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে। অসময়ী বন্যা, দীর্ঘায়িত খরা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ দেশের খাদ্য উৎপাদনকে ক্রমাগত হুমকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে দ্রুত নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রতি বছর দেশে আবাদি কৃষি জমি কমছে প্রায় ০.৫% হারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, স্মার্ট ও প্রিসিশন এগ্রিকালচার (Precision Agriculture) তথা প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা অনতিবিলম্বে প্রবর্তন না করলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে প্রধান দানাদার শস্যের উৎপাদন ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। এটি ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁঁকিতে ফেলবে। নেদারল্যান্ডসের মতো একটি ক্ষুদ্র দেশ যেখানে শুধু বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, গ্রিনহাউস প্রযুক্তি এবং ডাটানির্ভর চাষাবাদের মাধ্যমে আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে, আমাদেরও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে।ড্রোনের মাধ্যমে সার ও কীটনাশক ছিটানো, আইওটি (IoT) সেন্সর দিয়ে মাটির আর্দ্রতা মাপা এবং লবণাক্ততা ও খরা-সহিষ্ণু হাইব্রিড জাতের বীজ উদ্ভাবনে গবেষণাগারে বরাদ্দ দ্বিগুণ করতে হবে। রাজনীতি কেবল ক্ষমতা কেন্দ্রিক কৌশল বা জনসভার সস্তা করতালির মাধ্যম নয়; আধুনিক যুগে রাজনীতি হলো রাষ্ট্রপরিচালনা ও জনকল্যাণের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান। ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা এবং রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তিনটি বুদ্ধিবৃত্তিক স্তম্ভ অত্যন্ত জরুরি। যেমন- ১. থিঙ্ক-ট্যাংক সংস্কৃতি (গবেষণা ও তথ্যনির্ভর পলিসি), ২. যাগ্যতার মূল্যায়ন (মেধাবীদের নীতি-নির্ধারণে আনা) এবং ৩. প্রযুক্তি-বান্ধব সুশাসন (দুর্নীতিমুক্ত ডিজিটাল সেবা)। থিঙ্ক-ট্যাংক সংস্কৃতির বিকাশ: রাজনৈতিক দলগুলোকে পেশী শক্তি ও ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা উইং বা ‘থিঙ্ক-ট্যাংক’ গড়ে তুলতে হবে। উন্নত বিশ্বের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশবিদদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় পলিসি খসড়া তৈরি করতে হবে। যোগ্যতার মূল্যায়ন (Meritocracy): নীতিনির্ধারণী ও সংসদীয় পর্যায়ে চাটুকারিতা কিংবা আর্থিক লেনদেনের বদলে খাঁটি মেধা, সততা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। মেধার সঠিক মূল্যায়ন না হলে রাষ্ট্র পরিচালনার চাকা স্থবির হয়ে পড়ে। প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ সুশাসন: সরকারি ও প্রশাসনিক সব ধরনের সেবা সম্পূর্ণভাবে ব্লকচেইন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এতে একদিকে যেমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি হ্রাস পাবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ হবে। এই রূপান্তরের জন্য তীব্র রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসের প্রয়োজন।বর্তমানে জটিল ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং অর্থনৈতিক সমীকরণের এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আবেগ কিংবা তাৎক্ষণিক লোকদেখানো সস্তা সিদ্ধান্ত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সংকট দূর করা অসম্ভব। অতীতে ভুল পরিকল্পনার মাশুল এই জাতিকে বহু বছর ধরে গুনতে হয়েছে। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের ভাগ্য সুনিশ্চিত করতে হলে আমাদের রাজনীতিকে হতে হবে জ্ঞানভিত্তিক এবং রাষ্ট্রপরিচালনাকে হতে হবে দূরদর্শী ও বিজ্ঞানমনস্ক। মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং সুপরিকল্পিত রোডম্যাপের মাধ্যমেই বাংলাদেশ একটি স্বাবলম্বী, অর্থনৈতিকভাবে উন্নত এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে। তাই সময় ও ইতিহাসের অমোঘ দাবি মেনে দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়- চলমান সব সংকটের আবর্তে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক পরিকল্পনাই মুক্তির একমাত্র দূত’।লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
২০ আগস্ট ২০২৬
স্মৃতির ক্যানভাসে বিস্মৃতির দাগ
:: মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল ::বাঙালির জাতিগত মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তার বিস্মৃতিপ্রবণতা। তীব্র আবেগ এবং দ্রুত সবকিছু ভুলে যাওয়ার এক আত্মঘাতী মানসিকতা এই জনপদের মানুষের মজ্জাগত। ফরাসি দার্শনিক আর্নেস্ট রেনান তাঁর বিখ্যাত ‘হোয়াট ইজ এ নেশন?’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘জাতি গঠনে যেমন যৌথ স্মৃতি প্রয়োজন, তেমনি অনেক কিছু ভুলে যাওয়াও দরকার।’ কিন্তু বাঙালির ক্ষেত্রে এই ‘ভুলে যাওয়া’ কোনো দার্শনিক প্রয়োজন নয় বরং এক রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাধি। যে জাতি রক্তের নদী পেরিয়ে তার অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষা করে, সেই জাতিই কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই রক্তের ঋণ এবং ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা বিস্মৃত হয়। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকবদলে বাঙালির এই বিস্মৃতির ধরণ এবং তার চড়া মূল্য দেওয়ার খতিয়ান বিশ্লেষণ করা বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এক অতীব জরুরি বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণাধর্মী তাগিদ।১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের আত্মত্যাগ বাঙালিকে একটি নতুন ধর্মনিরপেক্ষ জাতিসত্তার পরিচয় দেয়। এই আন্দোলন শুধু ভাষার ছিল না, এটি ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম তীব্র সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আঘাত। ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষার অধিকার ঠিকই আদায় করেছিল, কিন্তু তার মূল চেতনা ধরে রাখতে পারেনি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর যে আইনি ও নৈতিক অঙ্গীকার ছিল, তা আজ দীর্ঘ সাত দশকেও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের উচ্চ আদালত, উচ্চশিক্ষা এবং করপোরেট ও প্রশাসনিক স্তরে বাংলা ভাষার পদাঙ্ক নিশ্চিত করা যায়নি। একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা যে তীব্র আবেগ দেখাই, বছরের বাকি ৩৬৪ দিন তা ইংরেজি বা ভিনদেশি ভাষার আগ্রাসনে হারিয়ে যায়। ভাষা আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ভুলে গিয়ে সমাজ বারবার মৌলবাদ ও সংকীর্ণতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে।১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ছাত্র সমাজের ১১ দফার ভিত্তিতে সংঘটিত হয় এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান। আসাদ, ডক্টর শামসুজ্জোহা, মতিউরের আত্মত্যাগের মুখে আইয়ুব খানের লৌহকঠিন সামরিক জান্তা পতন ঘটাতে বাধ্য হয় এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু সসম্মানে মুক্তি পান। এই আন্দোলন বাঙালিকে শিখিয়েছিল কীভাবে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে স্বৈরাচারকে বিদায় করতে হয়। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছিল নাগরিক অধিকার ও ফ্যাসিবাদের প্রশ্নে আপসহীন হতে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা দ্রুতই ভুলে যাই আইয়ুবীয় স্টাইলের স্বৈরাচারী ব্যবস্থার কুফল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্রেও বারবার সামরিক শাসন বা বেসামরিক একনায়কতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। যে ছাত্র সমাজ ও জনতা স্বৈরাচারের তখত উল্টে দিয়েছিল, ক্ষমতার পালাবদলের পর তারাই আবার নতুন কোনো শাসকের অন্ধ ভক্তে পরিণত হয়েছে। স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইয়ের মূল মন্ত্র- ‘গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ বাঙালি বারবার ভুলে গেছে।১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে শুরু হওয়া গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালি সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং কোটি মানুষের ঘরবাড়ি হারানোর মধ্য দিয়ে এই স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি ছিল তিনটি- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় নিয়ে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। স্বাধীনতার পর বাঙালির ভুলে যাওয়ার অভ্যাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও বীভৎস বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। যে জাতি কিছুদিন আগেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়েছিল, তারা এক অদ্ভুত জড়তা, উদাসীনতা ও বিস্মৃতির শিকার হলো। এরপর শুরু হলো ইতিহাসের উল্টোরথ যাত্রা। মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নিত ঘাতক-দালাল, রাজাকার ও আলবদরদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পুনর্বাসিত করা হলো; তাদের গাড়িতে ওড়ানো হলো লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত লাল-সবুজ পতাকা। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ঢেকে তরুণ প্রজন্মকে রাখা হলো সত্য থেকে দূরে। সবচেয়ে বড় বিস্মৃতি ঘটল মুক্তিযুদ্ধের মূল আকাক্সক্ষায়- সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাষ্ট্রে এক চরম ক্রনি-ক্যাপিটালিজম বা লুণ্ঠনমূলক অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করা হলো।নয় বছরের সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদ সরকারের পতনের লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে গড়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট এবং বামপন্থীদের ৫ দলীয় জোট মিলে ঘোষণা করে ‘তিন জোটের রূপরেখা’। এই রূপরেখার মূল ভিত্তি ছিল- অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, স্বৈরাচারী ও কালো আইন বাতিল এবং টেকসই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা। নূর হোসেন, ডা. মিলনের রক্তের বিনিময়ে ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারের পতন ঘটে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর তিন জোটের সেই ঐতিহাসিক রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ক্ষমতার চেয়ারে বসার পরপরই দলগুলো আবার পরমতসহিষ্ণুতা ভুলে গিয়ে পারস্পরিক প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করে। সংসদকে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে চলে একের পর এক সংসদ বয়কট ও রাজপথের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি। রূপরেখায় যে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা রূপ নেয় দলীয়করণ, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র এবং বিচার বিভাগের টুঁটি চেপে ধরার খেলায়। বাঙালি ভুলে গেল যে, গণতন্ত্র কেবল পাঁচ বছর পর পর ভোট দেওয়ার উৎসব নয়, এটি একটি নিত্যদিনের চর্চা ও সংস্কৃতির নাম।দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা একচ্ছত্র কর্তৃত্ববাদী শাসন, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, গুম-খুন, তীব্র অর্থনৈতিক লুণ্ঠন, মেগা প্রজেক্টের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে দেশে এক চরম ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছিল। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গর্জে ওঠে দেশের ছাত্র-জনতা। কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া এই সংগ্রাম সরকারি বাহিনীর নজিরবিহীন ও নৃশংস দমনপীড়নের মুখে রূপ নেয় এক দফার গণঅভ্যুত্থানে। আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, ওয়াসিমসহ শত শত শহীদের আত্মত্যাগ এবং হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ছাত্র-জনতার এই নজিরবিহীন বিজয়কে অভিহিত করা হয় ‘চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে। এই আন্দোলন রাষ্ট্র মেরামতের এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট দেয়।বাঙালির ভুলে যাওয়ার সহজাত অভ্যাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন চলছে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি ফ্যাসিবাদের স্থায়ী অবসান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল সংস্কার। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আন্দোলনের রক্ত শুকানোর আগেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিষাক্ত লক্ষণগুলো আবার দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয়করণ এবং ভিন্নমতের ওপর চড়াও হওয়ার প্রবণতা সমাজ থেকে পুরোপুরি দূর করা যায়নি। যে তরুণরা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে নতুন পথ দেখাল, তাদের সেই পবিত্র আত্মত্যাগকে ভুলে গিয়ে সমাজ যদি আবার দলীয় সংকীর্ণতা, সুবিধাবাদ ও মেরুকরণের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়, তবে এই গণঅভ্যুত্থানের অর্জনও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। পূর্বসূরিদের মতো চব্বিশের প্রজন্মও যদি ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যায়, তবে তা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও বেদনাদায়ক বিস্মৃতি।ইতিহাসের খতিয়ান ঘাঁটলে দেখা যায়, বাঙালি লড়তে জানে, বুক পেতে রক্ত দিতে জানে, কিন্তু অর্জিত বিজয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ধরে রাখতে জানে না। এর প্রধান কারণ- আমরা ইতিহাসের আবেগকে সস্তা স্লোগানে রূপান্তর করি, কিন্তু তার গভীর শিক্ষাকে ধারণ করি না। বিজয়ের পর আমরা এক ধরনের সাময়িক আত্মতুষ্টিতে ভুগি এবং দ্রুতই সব ভুলে গিয়ে আবার পুরোনো ভুলের ফাঁদে পা দিই। যদি আমরা ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে আগের আন্দোলনগুলোর মতো বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে দিতে না চাই, তবে আমাদের এই ‘সহজাত ভুলে যাওয়ার রোগ’ থেকে চিরতরে মুক্ত হতে হবে। প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকবদলের শহীদদের স্মৃতি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায়, স্মৃতিসৌধে বা নামফলকে বন্দী না রেখে- তাদের মূল আকাক্সক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতি, সংবিধান ও নাগরিক জীবনে প্রতিফলিত করতে হবে। বাঙালিকে ‘স্মৃতিভুক’ জাতি হওয়া বন্ধ করতে হবে; কারণ যে জাতি বারবার ইতিহাস ভুলে যায়, ইতিহাস তাকে বারবার স্বৈরাচারের শৃঙ্খলে বন্দী করে শাস্তি দেয়।লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
১২ আগস্ট ২০২৬
“আদর্শের লড়াই হয় বুদ্ধিবৃত্তিক”
:: মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল :: সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনের ইতিহাসে আজ আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় শক্তির সংজ্ঞায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। পেশিবল কিংবা মারণাস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে আজ আর কোনো জনপদকে দীর্ঘস্থায়ী শাসন করা সম্ভব নয়। ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখেছি, আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে চেঙ্গিস খান পর্যন্ত- সবাই তলোয়ারের মাধ্যমে ভূমি জয় করেছিলেন, কিন্তু মানুষের হৃদয় ও চেতনা জয় করতে পারেননি। এখানেই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের অপরিহার্যতা সামনে আসে। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘কলম তলোয়ারের চেয়ে শক্তিশালী’। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এই উক্তিটি কেবল আলঙ্কারিক নয় বরং এক কঠোর ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আদর্শের লড়াইটা আর ময়দানে নয় বরং হয়ে উঠেছে গভীরতর বুদ্ধিবৃত্তিক। একটি আদর্শ তখনই সমাজ ও রাষ্ট্রে শিকড় গেড়ে বসে, যখন তা যুক্তির নিক্তিতে উত্তীর্ণ হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক এই লড়াইয়ের মূল হাতিয়ার হলো জ্ঞান, তথ্য এবং বিশ্লেষণ। বর্তমান বিশ্বে আমরা দেখছি ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম শক্তির জয়জয়কার। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নাই এই ধারণার প্রবর্তক। তার মতে, একটি রাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নয় বরং তার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আদর্শ এবং পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে অন্য দেশের মন জয় করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, গত এক দশকে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের মোট বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় করছে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রসারে। ইউনেস্কোর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের জিডিপির প্রায় ২.৫% থেকে ৪.৫% পর্যন্ত গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে ব্যয় করে। এটি প্রমাণ করে তারা জানে, আগামির বিশ্ব শাসন করবে তারাই, যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত মজবুত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও আদর্শিক সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। আমরা প্রায়ই দেখি, রাজপথে স্লোগান আর পাল্টাপাল্টি হুঙ্কার দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এতে সাময়িক বিজয় এলেও দীর্ঘমেয়াদী কোনো আদর্শিক পরিবর্তন আসে না। আদর্শের লড়াই হওয়া উচিত টেবিল-টক, সেমিনার, পত্রিকার সম্পাদকীয় কলাম এবং সুস্থ বিতর্কের মাধ্যমে। যখন একটি গোষ্ঠী কেবল পেশিশক্তির ওপর নির্ভর করে তাদের মতবাদ চাপিয়ে দিতে চায়, তখন সমাজে অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থা জন্ম নেয়। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অভাব রয়েছে এবং যেখানে মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ, সেখানেই চরমপন্থা সবচেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়েছে। অর্থাৎ, তলোয়ার দিয়ে নয়, ভুল আদর্শকে মোকাবিলা করতে হয় সঠিক যুক্তি ও উন্নততর আদর্শ দিয়ে। একটি আদর্শের জয়যাত্রা অনেকটা প্রবহমান নদীর মতো। নদী যেমন তার চলার পথে পাহাড়-পাথরকে সরিয়ে দেয় না বরং নিজের গতিপথ তৈরি করে নেয়, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইও ঠিক তেমনি। এখানে প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নির্মূল করার চেয়ে তার চিন্তাধারাকে যুক্তির মাধ্যমে ভুল প্রমাণ করাটাই আসল বিজয়। ইমাম গাজ্জালি থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্স কিংবা গ্রামশি- সবার দর্শনেই আমরা দেখি, তারা তাদের সমসাময়িক ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। আন্তোনিও গ্রামশি তার ‘হেজেমনি’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, শাসক গোষ্ঠী কেবল পুলিশ বা সেনাবাহিনী দিয়ে শাসন করে না বরং তারা শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে জনমানুষের ওপর এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য কায়েম করে। তাই যারা বিকল্প আদর্শের কথা বলেন, তাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো একটি সবল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতি-কাঠামো গড়ে তোলা। আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের নতুন ক্ষেত্র হলো ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ ও ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’। স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ বিলিয়নের বেশি মানুষ ইন্টারনেটে সক্রিয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সামনে তথ্য ও অপতথ্যের এক মহাসমুদ্র। এখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি টুইট এবং প্রতিটি লেখা এক একটি আদর্শিক লড়াইয়ের অংশ। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে যুক্তির চেয়ে আবেগ এবং সত্যের চেয়ে মিথ্যার প্রচার অনেক দ্রুত ঘটছে। এমআইটি-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সত্য খবরের তুলনায় ভুয়া খবর ৬ গুণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিকূল পরিবেশে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াকুদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। কেবল আবেগ দিয়ে নয় বরং গভীর পঠন-পাঠন এবং নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। ২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি এখন আর কেবল আবেগ বা দলীয় আনুগত্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। তারা এখন ‘ডেটা-ড্রিভেন’ (Data-driven) বা তথ্যভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। এই পরিবর্তনের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের কিছু তত্ত্ব ও উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে- ১. মেরিটক্রেসি বনাম বংশপরম্পরা (তত্ত্ব: Meritocratic Leadership) বর্তমান তরুণরা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের চেয়ে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও মেধাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। যেমন: ২০২৬ সালের নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণরা কোনো নেতার পারিবারিক পরিচয়ের চেয়ে তার যোগ্যতা, বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান এবং সংকটকালীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে বেশি বিতর্ক করছে। তারা ‘যোগ্যতাই শ্রেষ্ঠত্ব’- এই বুদ্ধিবৃত্তিক তত্ত্বে বিশ্বাসী। ২. পলিসি বনাম স্লোগান (তত্ত্ব: Rational Choice Theory) তরুণরা এখন ফাঁকা স্লোগানের বদলে সুনির্দিষ্ট ‘পলিসি’ বা নীতিমালার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। যেমন- কোনো রাজনৈতিক দল ‘বেকারত্ব দূর করার’ সাধারণ প্রতিশ্রুতি দিলে তরুণরা তা গ্রহণ করছে না। বরং তারা প্রশ্ন তুলছে- ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে এআই (AI) মোকাবিলায় আপনাদের রোডম্যাপ কী?’ কিংবা ‘ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কর কাঠামো কেমন হবে?’ এই যে যৌক্তিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা, এটাই হলো বুদ্ধিবৃত্তিক আদর্শের লড়াই। ৩. ডিজিটাল জননিরাপত্তা ও নৈতিকতা (তত্ত্ব: Digital Sovereignty) ২০২৬-এর তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘স্বাধীনতা’ মানে কেবল ভূখণ্ড নয় বরং তথ্যের সুরক্ষা এবং ইন্টারনেটে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। যেমন- সাইবার সিকিউরিটি আইন বা ডেটা প্রাইভেসির মতো জটিল বিষয়গুলো এখন পাড়ার চায়ের দোকানে তরুণদের আলোচনার বিষয়। যারা এই ডিজিটাল অধিকারের পক্ষে শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দিতে পারছে, তরুণ সমাজ সেই আদর্শের দিকেই ঝুঁঁকছে। ৪. জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন (তত্ত্ব: Intergenerational Justice) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষায় তরুণরা এখন আপসহীন। যেমন- কোনো বড় শিল্প প্রকল্প বা নগরায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তরুণরা বৈজ্ঞানিক তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে লড়াই করছে। তারা কেবল উন্নয়ন চায় না, ‘টেকসই উন্নয়ন’ চায়। এটি একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান যা প্রচলিত ‘উন্নয়ন মানেই ইট-পাথর’- এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তরুণদের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে রাজনীতি এখন আর শুধুমাত্র মাঠের লড়াই নয় বরং এটি ল্যাপটপের কিবোর্ড এবং যুক্তির টেবিলে স্থানান্তরিত হয়েছে। ২০২৬ সালের তরুণরা এমন এক আদর্শ খুঁজছে যা তাদের মেধা ও আধুনিক বিশ্বের চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ। শিক্ষাব্যবস্থাকে বলা হয় আদর্শিক লড়াইয়ের সূতিকাগার। একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার পাঠ্যপুস্তক ও শ্রেণিকক্ষের আলোচনার মধ্য দিয়ে। আমরা যদি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিই, যদি তাদের সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking) করার দক্ষতা তৈরি না করি, তবে তারা কোনোদিনও সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবে না। বিশ্বের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আজ আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম কেন নেই? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের গবেষণার অভাব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যদশার মধ্যে। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় উচ্চশিক্ষায় আমাদের গবেষণার বরাদ্দ এবং মান উভয়ই উদ্বেগজনকভাবে নিচের দিকে। এই শূন্যতা যদি পূর্ণ না হয়, তবে বিজাতীয় আদর্শ বা ক্ষতিকর মতবাদ আমাদের সমাজকে খুব সহজেই গ্রাস করে নেবে। উপমা দিয়ে বললে, একটি গাছ যেমন তার শেকড় থেকে রসদ সংগ্রহ করে টিকে থাকে, আদর্শের লড়াইও তেমনি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শেকড় থেকে প্রাণশক্তি পায়। যে আদর্শের কোনো শেকড় নেই তা বর্ষার কচুরিপানার মতো ভেসে যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের জাতীয় জীবনে এক ধরনের শূন্যতা কাজ করছে। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য তথাকথিত বুদ্ধিজীবী নয় বরং প্রকৃত প্রজ্ঞাবান মানুষের প্রয়োজন। যারা কেবল ক্ষমতার তোষণ করবেন না বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের কথা বলবেন। মনে রাখতে হবে, বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যই হলো একটি জাতির সবচেয়ে বড় পরাজয়। পরিশেষে বলা যায়, আদর্শের লড়াই কোনো ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া নয় বরং এটি একটি সৃষ্টিশীল বিবর্তন। এই লড়াইয়ে জেতার অর্থ কাউকে রক্তাক্ত করা নয় বরং মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে সেখানে জ্ঞানের আলো জ্বালানো। বর্তমানে আমরা যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তার টেকসই সমাধান কোনো সাময়িক মেরামতে নেই; আছে মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণে। পত্রিকা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা যখন কোনো একটি মত প্রকাশ করি, তখন সেটি কেবল একটি কলাম বা পোস্ট নয়, সেটি একটি আদর্শিক বীজ। এই বীজ যদি যুক্তিনির্ভর এবং জনকল্যাণমুখী হয়- তবে তা একদিন বিশাল মহীরুহে পরিণত হবে। ‘আদর্শের লড়াই হয় বুদ্ধিবৃত্তিক’- এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে যদি আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি, তবেই আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্থবহ হবে। তাই সংকীর্ণতা আর বিদ্বেষ নয়, মেধা ও যুক্তির লড়াই হোক আদর্শিক বিজয়ের হাতিয়ার। কারণ দিনশেষে ডানাভাঙা পাখির মতো ছটফট করে পেশিশক্তি, আর ঈগলের মতো আকাশে উড়ে বেড়ায় জয়ী আদর্শ। জয় হোক কলমের, জয় হোক সত্য ও সুন্দরের। লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
১৮ মে ২০২৬
বৈশাখী পদযাত্রা : সংকট ও রূপান্তর
মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল: বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব, হাজার বছরের চিরায়ত ঐতিহ্যের মিলনমেলা। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এটি বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। এই উৎসবের অন্যতম আধুনিক সংযোজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হওয়া বর্ণিল শোভাযাত্রা, যা দীর্ঘকাল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়ে আসছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়ায় এই শোভাযাত্রার নাম আজ এক গোলকধাঁধায় বন্দি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ক্ষমতার পালাবদলে এই শোভাযাত্রার নামকরণে যে ঘনঘন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে- তা বৃহত্তর জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। কখনও ‘মঙ্গল’, কখনও ‘আনন্দ’, আর এখন স্রেফ ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করার যে তৎপরতা- তা কি কেবল একটি নাম বদলের চেষ্টা, নাকি বাঙালির হাজার বছরের লালিত অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে কুঠারাঘাত? এই নামকরণের আবর্তে কি আমাদের সংস্কৃতির মূল সুরটি হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি এই নাম পরিবর্তনের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ। এই প্রশ্নগুলো আজ জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে। মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়, কিন্তু এর শেকড় অনেক গভীরে। ১৯৮৯ সালে তৎকালীন সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র ও শিক্ষকরা মিলে এই শোভাযাত্রার সূচনা করেন। এই পদযাত্রার মূল সুর ছিল অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে শুভ শক্তির আবাহন। বিশালকায় পাখি, হাতি, মাছ এবং লোকজ মোটিফের মুখোশ নিয়ে রাজপথে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দ্রুতই জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবজাতির বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন এটি বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজনীন এক উৎসবে পরিণত হয়। ‘মঙ্গল’ শব্দটি এখানে কোনো ধর্মীয় অর্থে নয়, বরং কল্যাণ বা শুভকামনার অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল- যা বাঙালির লোকজ ও সুফি ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে। বিশ্বদরবারে এই ‘মঙ্গল’ শব্দটির অর্থ ছিল ‘সবার জন্য কল্যাণ’। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এই সংস্কারের ঢেউ এসে লাগে বাংলা নববর্ষের আয়োজনেও। ‘মঙ্গল’ শব্দটিকে ঘিরে তৈরি হয় রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিতর্কের দেয়াল। গত পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সময় সরকারি নথিপত্র এবং নির্দেশনায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ শব্দটির পরিবর্তে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ শব্দটির প্রচলন শুরু হয়। সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল উৎসবের মূল নির্যাস হলো ‘আনন্দ’, তাই এই শব্দটি অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক। তবে সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ‘মঙ্গল’ শব্দটি পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যের আদি পরিচয় এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত নামের আবেদনকে কিছুটা হালকা করে ফেলা হয়েছে। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই একটি প্রতিষ্ঠিত নাম বদলে ফেলা সংস্কৃতির ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শামিল। বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন বছরের শোভাযাত্রার নামকরণের বিতর্কটি নতুন মাত্রা পায়। বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ মনে করছে ‘মঙ্গল’ এবং ‘আনন্দ’- উভয় শব্দের মধ্যেই পরোক্ষভাবে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বলয়ের প্রভাব বা ‘সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ’ রয়েছে। নববর্ষের এই শোভাযাত্রাকে ঘিরে অতীতে যে বিতর্ক ও ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল, তার মূলে ছিল শব্দ চয়ন। ‘মঙ্গল’ শব্দটি অনেক ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়, আবার ‘আনন্দ’ শব্দটি উৎসবের গভীরতাকে ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারছে না। ফলে সরকার এই নামকরণের জটিলতা নিরসনে এবং একে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্ক মুক্ত রাখতে সরাসরি ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নাম করার প্রস্তাব করেছে। যুক্তি হলো, পহেলা বৈশাখ যেহেতু বৈশাখ মাসের উৎসব, তাই ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামটিই হবে সবচেয়ে নিরপেক্ষ এবং সর্বজনগ্রাহ্য। তাই সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ঘোষণা করেন, বিতর্ক অবসানে এখন থেকে এটি হবে কেবলই ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এ নিয়ে শুধু বিতর্কই হচ্ছেনা- বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্তও। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে ৫ এপ্রিল রিট আবেদন করা হয়েছে। সেখানে এই শোভাযাত্রাকে ‘নব-সৃষ্ট ও কৃত্রিম’ কার্যক্রম হিসেবে দাবি করে একে চিরতরে বন্ধের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, পহেলা বৈশাখের এই শোভাযাত্রা কোনো প্রাচীন বাঙালি ঐতিহ্য নয়; এটি ১৯৮৯ সালে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবে শুরু হয়েছিল। রিটকারীর দাবি- মাছ, পাখি ও পশুপাখির প্রতিকৃতি নিয়ে মঙ্গল কামনা করা মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁঁকি তৈরি করতে পারে। রিটকারীর মতে, এটি বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য নয় এবং এর সাথে যুক্ত বিভিন্ন অনুষঙ্গ ইসলামি আকিদার বিরোধী। আদালতে এই ধরনের রিট আসার বিষয়টি আমাদের সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তনের এক অন্ধকার দিক নির্দেশ করে। এই নাম পরিবর্তনে শব্দ দুটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। ‘মঙ্গল’ শব্দের অর্থ নিয়ে রয়েছে টানাপোড়েন। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, ‘মঙ্গল’ শব্দটি হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাদের দাবি, মূর্তিনির্ভর বা নির্দিষ্ট প্রতীকের মাধ্যমে ‘মঙ্গল’ কামনা করা মুসলিম ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে সংস্কৃতিমনাদের মতে, মঙ্গল কোনো ধর্মের একচেটিয়া নয়, বরং এটি কল্যাণের এক বৈশ্বিক প্রার্থনা। ‘মঙ্গল’ শব্দে আপত্তি ওঠায় যখন ‘আনন্দ’ শব্দটি আনা হলো, তখনো কিন্তু বিতর্কের অবসান হয়নি। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো মনে করে, এই নামকরণের নেপথ্যেও সুপ্ত সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাজনীতি রয়েছে। ফলে বর্তমানে ‘মঙ্গল’ ও ‘আনন্দ’ উভয় শব্দকেই বাদ দিয়ে একটি ধর্মীয় নিরপেক্ষ বা বর্ণনামূলক নাম দেওয়ার দাবি ওঠে- তা হতে পারে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। তাতেও বিতর্কের অবসান হয়েছে বলে মনে হচ্ছেনা। আগামিতে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বছরের নয় ‘মাসের’ বলে আপত্তি তুলে ‘নববর্ষের শোভাযাত্রা’ দাবি করা হবেনা- এ নিশ্চয়তা কোথায়? শব্দতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাকারীরা জানেন, সপ্তাহের সাতটা দিনের নাম দেব-দেবীর নাম থেকে এসেছে। রবি মানে সূর্য দেবতা, সোম মানে চন্দ্র বা শিব, আর ‘মঙ্গলবার’ হচ্ছে মঙ্গল গ্রহ বা হনুমান বা মঙ্গল চণ্ডীর দিন। বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি- এসবই গ্রহ আর দেব-দেবীর নাম। মঙ্গল যদি সাম্প্রদায়িক তকমা নিয়ে বাদ যায়, তবে বৈশাখীও তো বাদ যাওয়ার কথা। কারণ বৈশাখ শব্দটা এসেছে ‘বিশাখা’ নক্ষত্র থেকে। হিন্দু পুরাণ মতে, বিশাখা হলেন দক্ষরাজের কন্যা এবং ব্রহ্মার নাতনি। মঙ্গলকে অর্থাৎ মঙ্গল গ্রহ বা হনুমান বা মঙ্গল চণ্ডীকে সাম্প্রদায়িকতার দাঁড়িপাল্লায় মাপলে বিশাখা আরও বেশি সাম্প্রদায়িক। ‘মঙ্গল’ শব্দটা যদি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে বাদ দেওয়া যায়। ধর্মীয় গ্রন্থে বহুল ব্যবহৃত ‘আনন্দ’ শব্দটাকে সংস্কৃত হওয়ায় বাদ দেওয়া হয়। তবে বৈশাখীও বাদ যাওয়ার কথা। নামকরণের এই ঘনঘন পরিবর্তন আসলে আমাদের জাতীয় জীবনের গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণেরই প্রতিফলন। একদিকে এক পক্ষ মনে করেন, ‘মঙ্গল’ শব্দটি আমাদের হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, এর সাথে ধর্মের কোনো সংঘাত নেই। বরং এটি শুভবোধের প্রতীক। অন্যদিকে, অপর পক্ষ মনে করেন, শব্দের ব্যবহারেও জনমানসের বৃহত্তর অংশের সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত যাতে উৎসবটি সত্যি সত্যি ‘সর্বজনীন’ রূপ পায়। একটি নাম যখন ঐতিহ্যে পরিণত হয়, তখন সেটি আর কেবল শব্দ থাকে না- তা হয়ে ওঠে একটি জাতির পরিচয়। বাঙালি যেদিন থেকে বাঙালিত্ব বাদ দিয়ে ধর্মতত্ত্বকে প্রাধান্য দেওয়া শুরু করেছে সেদিনই নিজেদের মধ্যে বিভক্তি-বিবাদ শুরু হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক মহলে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং ইউনেস্কোর স্বীকৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নিয়ে সংশয় দেখা দিতে পারে। আবার বৈশাখী শোভাযাত্রা নাম করার মাধ্যমে যদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে উৎসবে সামিল করা যায়, তবে তা সামাজিক সংহতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। এই যে ‘মঙ্গল’ থেকে ‘আনন্দ’ এবং শেষমেশ ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’র দিকে ধাবিত হওয়া- এটি কি বিবর্তন নাকি বিচুতি? প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি জাতির সংস্কৃতি যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তার স্বকীয়তা হারিয়ে যায়। বৈশাখী শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের এই দাবিগুলো মূলত এক ধরনের ‘সংস্কৃতিভীতি’ থেকে জন্মেছে। যখন কোনো গোষ্ঠী মনে করে যে একটি বিশেষ শব্দ বা উৎসব তাদের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে- তখনই তারা তার নাম বা রূপ বদলাতে চায়। বাঙালির দীর্ঘ লড়াই ছিল ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা রেখে একটি সমন্বিত বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে তোলা। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ- সবখানেই মূলমন্ত্র ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। সাধারণ মানুষের কাছে বড় প্রশ্ন হলো- নাম যা-ই হোক, উৎসবের প্রাণভোমরা কি অক্ষুন্ন থাকছে? মাটির সরা, মুখোশ আর লোকজ বাদ্যের সেই চিরচেনা রূপ কি রাজনৈতিক রঙের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবে? পহেলা বৈশাখ কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা নির্দিষ্ট মতাদর্শের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সাধারণ কৃষকের হালখাতা থেকে শুরু করে নগরের রাজপথের বর্ণিল মিছিল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বৃহৎ ক্যানভাস। মঙ্গল, আনন্দ কিংবা বৈশাখী শোভাযাত্রা- নামের চেয়েও বড় সত্য হলো বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আকাক্সক্ষা। রাজনৈতিক পালাবদলে নামকরণের পরিবর্তন হয়তো প্রশাসনিকভাবে সহজ, কিন্তু মানুষের মন থেকে কোনো সাংস্কৃতিক চেতনা মুছে ফেলা কঠিন। একটি জাতির প্রাণশক্তি নিহিত থাকে তার সংস্কৃতির স্বকীয়তায়। পহেলা বৈশাখ আমাদের সেই স্বকীয়তার ধারক। নাম নিয়ে বিতর্ক কমিয়ে যদি উৎসবের চেতনাকে সমুন্নত রাখা যায়- তবেই তা সার্থক হবে। আশা করা যায়, সব রাজনৈতিক বিতর্ক এবং সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে বাংলা নববর্ষ হয়ে উঠবে সত্যিকারের মিলনের মহামঞ্চ। যেখানে নামের বিভেদ থাকবে না, থাকবে শুধু সম্প্রীতির এক অনন্য বাংলাদেশ। বৈশাখী শোভাযাত্রা বা আনন্দ শোভাযাত্রা অথবা মঙ্গল শোভাযাত্রা- পরিচয় যা-ই হোক, তা যেন বাঙালির অসাম্প্রদায়িক আত্মাকে বিশ্বদরবারে সগৌরবে তুলে ধরে। বাঙালির এই বর্ণিল পদযাত্রাকে রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় বন্দি না করে, একে তার স্বনামে এবং স্বমহিমায় টিকে থাকতে দেওয়াটাই হবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও উদারমনা আচরণ। অন্যথায়, ‘মঙ্গল’ বা ‘আনন্দ’ অথবা ‘বৈশাখী’ হারিয়ে আমরা কেবল একটি প্রাণহীন ‘শোভাযাত্রা’র সাক্ষী হয়ে থাকব- যা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পাতায় কেবল এক করুণ অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হবে। লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
০৮ এপ্রিল ২০২৬