সম্পাদকীয়

“আদর্শের লড়াই হয় বুদ্ধিবৃত্তিক”

“আদর্শের লড়াই হয় বুদ্ধিবৃত্তিক”

:: মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল :: সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনের ইতিহাসে আজ আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় শক্তির সংজ্ঞায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। পেশিবল কিংবা মারণাস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে আজ আর কোনো জনপদকে দীর্ঘস্থায়ী শাসন করা সম্ভব নয়। ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখেছি, আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে চেঙ্গিস খান পর্যন্ত- সবাই তলোয়ারের মাধ্যমে ভূমি জয় করেছিলেন, কিন্তু মানুষের হৃদয় ও চেতনা জয় করতে পারেননি। এখানেই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের অপরিহার্যতা সামনে আসে। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘কলম তলোয়ারের চেয়ে শক্তিশালী’। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এই উক্তিটি কেবল আলঙ্কারিক নয় বরং এক কঠোর ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আদর্শের লড়াইটা আর ময়দানে নয় বরং হয়ে উঠেছে গভীরতর বুদ্ধিবৃত্তিক। একটি আদর্শ তখনই সমাজ ও রাষ্ট্রে শিকড় গেড়ে বসে, যখন তা যুক্তির নিক্তিতে উত্তীর্ণ হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক এই লড়াইয়ের মূল হাতিয়ার হলো জ্ঞান, তথ্য এবং বিশ্লেষণ। বর্তমান বিশ্বে আমরা দেখছি ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম শক্তির জয়জয়কার। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নাই এই ধারণার প্রবর্তক। তার মতে, একটি রাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নয় বরং তার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আদর্শ এবং পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে অন্য দেশের মন জয় করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, গত এক দশকে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের মোট বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় করছে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রসারে। ইউনেস্কোর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের জিডিপির প্রায় ২.৫% থেকে ৪.৫% পর্যন্ত গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে ব্যয় করে। এটি প্রমাণ করে তারা জানে, আগামির বিশ্ব শাসন করবে তারাই, যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত মজবুত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও আদর্শিক সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। আমরা প্রায়ই দেখি, রাজপথে স্লোগান আর পাল্টাপাল্টি হুঙ্কার দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এতে সাময়িক বিজয় এলেও দীর্ঘমেয়াদী কোনো আদর্শিক পরিবর্তন আসে না। আদর্শের লড়াই হওয়া উচিত টেবিল-টক, সেমিনার, পত্রিকার সম্পাদকীয় কলাম এবং সুস্থ বিতর্কের মাধ্যমে। যখন একটি গোষ্ঠী কেবল পেশিশক্তির ওপর নির্ভর করে তাদের মতবাদ চাপিয়ে দিতে চায়, তখন সমাজে অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থা জন্ম নেয়। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অভাব রয়েছে এবং যেখানে মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ, সেখানেই চরমপন্থা সবচেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়েছে। অর্থাৎ, তলোয়ার দিয়ে নয়, ভুল আদর্শকে মোকাবিলা করতে হয় সঠিক যুক্তি ও উন্নততর আদর্শ দিয়ে। একটি আদর্শের জয়যাত্রা অনেকটা প্রবহমান নদীর মতো। নদী যেমন তার চলার পথে পাহাড়-পাথরকে সরিয়ে দেয় না বরং নিজের গতিপথ তৈরি করে নেয়, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইও ঠিক তেমনি। এখানে প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নির্মূল করার চেয়ে তার চিন্তাধারাকে যুক্তির মাধ্যমে ভুল প্রমাণ করাটাই আসল বিজয়। ইমাম গাজ্জালি থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্স কিংবা গ্রামশি- সবার দর্শনেই আমরা দেখি, তারা তাদের সমসাময়িক ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। আন্তোনিও গ্রামশি তার ‘হেজেমনি’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, শাসক গোষ্ঠী কেবল পুলিশ বা সেনাবাহিনী দিয়ে শাসন করে না বরং তারা শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে জনমানুষের ওপর এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য কায়েম করে। তাই যারা বিকল্প আদর্শের কথা বলেন, তাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো একটি সবল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতি-কাঠামো গড়ে তোলা। আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের নতুন ক্ষেত্র হলো ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ ও ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’। স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ বিলিয়নের বেশি মানুষ ইন্টারনেটে সক্রিয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সামনে তথ্য ও অপতথ্যের এক মহাসমুদ্র। এখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি টুইট এবং প্রতিটি লেখা এক একটি আদর্শিক লড়াইয়ের অংশ। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে যুক্তির চেয়ে আবেগ এবং সত্যের চেয়ে মিথ্যার প্রচার অনেক দ্রুত ঘটছে। এমআইটি-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সত্য খবরের তুলনায় ভুয়া খবর ৬ গুণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিকূল পরিবেশে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াকুদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। কেবল আবেগ দিয়ে নয় বরং গভীর পঠন-পাঠন এবং নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। ২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি এখন আর কেবল আবেগ বা দলীয় আনুগত্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। তারা এখন ‘ডেটা-ড্রিভেন’ (Data-driven) বা তথ্যভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। এই পরিবর্তনের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের কিছু তত্ত্ব ও উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে- ১. মেরিটক্রেসি বনাম বংশপরম্পরা (তত্ত্ব: Meritocratic Leadership) বর্তমান তরুণরা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের চেয়ে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও মেধাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। যেমন: ২০২৬ সালের নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণরা কোনো নেতার পারিবারিক পরিচয়ের চেয়ে তার যোগ্যতা, বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান এবং সংকটকালীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে বেশি বিতর্ক করছে। তারা ‘যোগ্যতাই শ্রেষ্ঠত্ব’- এই বুদ্ধিবৃত্তিক তত্ত্বে বিশ্বাসী। ২. পলিসি বনাম স্লোগান (তত্ত্ব: Rational Choice Theory) তরুণরা এখন ফাঁকা স্লোগানের বদলে সুনির্দিষ্ট ‘পলিসি’ বা নীতিমালার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। যেমন- কোনো রাজনৈতিক দল ‘বেকারত্ব দূর করার’ সাধারণ প্রতিশ্রুতি দিলে তরুণরা তা গ্রহণ করছে না। বরং তারা প্রশ্ন তুলছে- ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে এআই (AI) মোকাবিলায় আপনাদের রোডম্যাপ কী?’ কিংবা ‘ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কর কাঠামো কেমন হবে?’ এই যে যৌক্তিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা, এটাই হলো বুদ্ধিবৃত্তিক আদর্শের লড়াই। ৩. ডিজিটাল জননিরাপত্তা ও নৈতিকতা (তত্ত্ব: Digital Sovereignty) ২০২৬-এর তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘স্বাধীনতা’ মানে কেবল ভূখণ্ড নয় বরং তথ্যের সুরক্ষা এবং ইন্টারনেটে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। যেমন- সাইবার সিকিউরিটি আইন বা ডেটা প্রাইভেসির মতো জটিল বিষয়গুলো এখন পাড়ার চায়ের দোকানে তরুণদের আলোচনার বিষয়। যারা এই ডিজিটাল অধিকারের পক্ষে শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দিতে পারছে, তরুণ সমাজ সেই আদর্শের দিকেই ঝুঁঁকছে। ৪. জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন (তত্ত্ব: Intergenerational Justice) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষায় তরুণরা এখন আপসহীন। যেমন- কোনো বড় শিল্প প্রকল্প বা নগরায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তরুণরা বৈজ্ঞানিক তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে লড়াই করছে। তারা কেবল উন্নয়ন চায় না, ‘টেকসই উন্নয়ন’ চায়। এটি একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান যা প্রচলিত ‘উন্নয়ন মানেই ইট-পাথর’- এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তরুণদের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে রাজনীতি এখন আর শুধুমাত্র মাঠের লড়াই নয় বরং এটি ল্যাপটপের কিবোর্ড এবং যুক্তির টেবিলে স্থানান্তরিত হয়েছে। ২০২৬ সালের তরুণরা এমন এক আদর্শ খুঁজছে যা তাদের মেধা ও আধুনিক বিশ্বের চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ। শিক্ষাব্যবস্থাকে বলা হয় আদর্শিক লড়াইয়ের সূতিকাগার। একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার পাঠ্যপুস্তক ও শ্রেণিকক্ষের আলোচনার মধ্য দিয়ে। আমরা যদি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিই, যদি তাদের সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking) করার দক্ষতা তৈরি না করি, তবে তারা কোনোদিনও সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবে না। বিশ্বের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আজ আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম কেন নেই? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের গবেষণার অভাব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যদশার মধ্যে। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় উচ্চশিক্ষায় আমাদের গবেষণার বরাদ্দ এবং মান উভয়ই উদ্বেগজনকভাবে নিচের দিকে। এই শূন্যতা যদি পূর্ণ না হয়, তবে বিজাতীয় আদর্শ বা ক্ষতিকর মতবাদ আমাদের সমাজকে খুব সহজেই গ্রাস করে নেবে। উপমা দিয়ে বললে, একটি গাছ যেমন তার শেকড় থেকে রসদ সংগ্রহ করে টিকে থাকে, আদর্শের লড়াইও তেমনি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শেকড় থেকে প্রাণশক্তি পায়। যে আদর্শের কোনো শেকড় নেই তা বর্ষার কচুরিপানার মতো ভেসে যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের জাতীয় জীবনে এক ধরনের শূন্যতা কাজ করছে। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য তথাকথিত বুদ্ধিজীবী নয় বরং প্রকৃত প্রজ্ঞাবান মানুষের প্রয়োজন। যারা কেবল ক্ষমতার তোষণ করবেন না বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের কথা বলবেন। মনে রাখতে হবে, বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যই হলো একটি জাতির সবচেয়ে বড় পরাজয়। পরিশেষে বলা যায়, আদর্শের লড়াই কোনো ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া নয় বরং এটি একটি সৃষ্টিশীল বিবর্তন। এই লড়াইয়ে জেতার অর্থ কাউকে রক্তাক্ত করা নয় বরং মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে সেখানে জ্ঞানের আলো জ্বালানো। বর্তমানে আমরা যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তার টেকসই সমাধান কোনো সাময়িক মেরামতে নেই; আছে মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণে। পত্রিকা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা যখন কোনো একটি মত প্রকাশ করি, তখন সেটি কেবল একটি কলাম বা পোস্ট নয়, সেটি একটি আদর্শিক বীজ। এই বীজ যদি যুক্তিনির্ভর এবং জনকল্যাণমুখী হয়- তবে তা একদিন বিশাল মহীরুহে পরিণত হবে। ‘আদর্শের লড়াই হয় বুদ্ধিবৃত্তিক’- এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে যদি আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি, তবেই আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্থবহ হবে। তাই সংকীর্ণতা আর বিদ্বেষ নয়, মেধা ও যুক্তির লড়াই হোক আদর্শিক বিজয়ের হাতিয়ার। কারণ দিনশেষে ডানাভাঙা পাখির মতো ছটফট করে পেশিশক্তি, আর ঈগলের মতো আকাশে উড়ে বেড়ায় জয়ী আদর্শ। জয় হোক কলমের, জয় হোক সত্য ও সুন্দরের। লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

১৮ মে ২০২৬

বৈশাখী পদযাত্রা : সংকট ও রূপান্তর

বৈশাখী পদযাত্রা : সংকট ও রূপান্তর

মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল: বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব, হাজার বছরের চিরায়ত ঐতিহ্যের মিলনমেলা। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এটি বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। এই উৎসবের অন্যতম আধুনিক সংযোজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হওয়া বর্ণিল শোভাযাত্রা, যা দীর্ঘকাল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়ে আসছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়ায় এই শোভাযাত্রার নাম আজ এক গোলকধাঁধায় বন্দি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ক্ষমতার পালাবদলে এই শোভাযাত্রার নামকরণে যে ঘনঘন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে- তা বৃহত্তর জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। কখনও ‘মঙ্গল’, কখনও ‘আনন্দ’, আর এখন স্রেফ ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ করার যে তৎপরতা- তা কি কেবল একটি নাম বদলের চেষ্টা, নাকি বাঙালির হাজার বছরের লালিত অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে কুঠারাঘাত? এই নামকরণের আবর্তে কি আমাদের সংস্কৃতির মূল সুরটি হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি এই নাম পরিবর্তনের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণ। এই প্রশ্নগুলো আজ জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে। মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়, কিন্তু এর শেকড় অনেক গভীরে। ১৯৮৯ সালে তৎকালীন সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্র ও শিক্ষকরা মিলে এই শোভাযাত্রার সূচনা করেন। এই পদযাত্রার মূল সুর ছিল অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে শুভ শক্তির আবাহন। বিশালকায় পাখি, হাতি, মাছ এবং লোকজ মোটিফের মুখোশ নিয়ে রাজপথে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দ্রুতই জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবজাতির বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন এটি বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজনীন এক উৎসবে পরিণত হয়। ‘মঙ্গল’ শব্দটি এখানে কোনো ধর্মীয় অর্থে নয়, বরং কল্যাণ বা শুভকামনার অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল- যা বাঙালির লোকজ ও সুফি ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে। বিশ্বদরবারে এই ‘মঙ্গল’ শব্দটির অর্থ ছিল ‘সবার জন্য কল্যাণ’। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এই সংস্কারের ঢেউ এসে লাগে বাংলা নববর্ষের আয়োজনেও। ‘মঙ্গল’ শব্দটিকে ঘিরে তৈরি হয় রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিতর্কের দেয়াল। গত পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সময় সরকারি নথিপত্র এবং নির্দেশনায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ শব্দটির পরিবর্তে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ শব্দটির প্রচলন শুরু হয়। সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল উৎসবের মূল নির্যাস হলো ‘আনন্দ’, তাই এই শব্দটি অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক। তবে সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ‘মঙ্গল’ শব্দটি পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যের আদি পরিচয় এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত নামের আবেদনকে কিছুটা হালকা করে ফেলা হয়েছে। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই একটি প্রতিষ্ঠিত নাম বদলে ফেলা সংস্কৃতির ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শামিল। বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন বছরের শোভাযাত্রার নামকরণের বিতর্কটি নতুন মাত্রা পায়। বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ মনে করছে ‘মঙ্গল’ এবং ‘আনন্দ’- উভয় শব্দের মধ্যেই পরোক্ষভাবে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বলয়ের প্রভাব বা ‘সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ’ রয়েছে। নববর্ষের এই শোভাযাত্রাকে ঘিরে অতীতে যে বিতর্ক ও ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল, তার মূলে ছিল শব্দ চয়ন। ‘মঙ্গল’ শব্দটি অনেক ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়, আবার ‘আনন্দ’ শব্দটি উৎসবের গভীরতাকে ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারছে না। ফলে সরকার এই নামকরণের জটিলতা নিরসনে এবং একে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্ক মুক্ত রাখতে সরাসরি ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নাম করার প্রস্তাব করেছে। যুক্তি হলো, পহেলা বৈশাখ যেহেতু বৈশাখ মাসের উৎসব, তাই ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামটিই হবে সবচেয়ে নিরপেক্ষ এবং সর্বজনগ্রাহ্য। তাই সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ঘোষণা করেন, বিতর্ক অবসানে এখন থেকে এটি হবে কেবলই ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এ নিয়ে শুধু বিতর্কই হচ্ছেনা- বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্তও। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে ৫ এপ্রিল রিট আবেদন করা হয়েছে। সেখানে এই শোভাযাত্রাকে ‘নব-সৃষ্ট ও কৃত্রিম’ কার্যক্রম হিসেবে দাবি করে একে চিরতরে বন্ধের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, পহেলা বৈশাখের এই শোভাযাত্রা কোনো প্রাচীন বাঙালি ঐতিহ্য নয়; এটি ১৯৮৯ সালে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হিসেবে শুরু হয়েছিল। রিটকারীর দাবি- মাছ, পাখি ও পশুপাখির প্রতিকৃতি নিয়ে মঙ্গল কামনা করা মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁঁকি তৈরি করতে পারে। রিটকারীর মতে, এটি বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য নয় এবং এর সাথে যুক্ত বিভিন্ন অনুষঙ্গ ইসলামি আকিদার বিরোধী। আদালতে এই ধরনের রিট আসার বিষয়টি আমাদের সমাজতাত্ত্বিক বিবর্তনের এক অন্ধকার দিক নির্দেশ করে। এই নাম পরিবর্তনে শব্দ দুটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। ‘মঙ্গল’ শব্দের অর্থ নিয়ে রয়েছে টানাপোড়েন। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, ‘মঙ্গল’ শব্দটি হিন্দুয়ানি সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাদের দাবি, মূর্তিনির্ভর বা নির্দিষ্ট প্রতীকের মাধ্যমে ‘মঙ্গল’ কামনা করা মুসলিম ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে সংস্কৃতিমনাদের মতে, মঙ্গল কোনো ধর্মের একচেটিয়া নয়, বরং এটি কল্যাণের এক বৈশ্বিক প্রার্থনা। ‘মঙ্গল’ শব্দে আপত্তি ওঠায় যখন ‘আনন্দ’ শব্দটি আনা হলো, তখনো কিন্তু বিতর্কের অবসান হয়নি। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো মনে করে, এই নামকরণের নেপথ্যেও সুপ্ত সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাজনীতি রয়েছে। ফলে বর্তমানে ‘মঙ্গল’ ও ‘আনন্দ’ উভয় শব্দকেই বাদ দিয়ে একটি ধর্মীয় নিরপেক্ষ বা বর্ণনামূলক নাম দেওয়ার দাবি ওঠে- তা হতে পারে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। তাতেও বিতর্কের অবসান হয়েছে বলে মনে হচ্ছেনা। আগামিতে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বছরের নয় ‘মাসের’ বলে আপত্তি তুলে ‘নববর্ষের শোভাযাত্রা’ দাবি করা হবেনা- এ নিশ্চয়তা কোথায়? শব্দতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাকারীরা জানেন, সপ্তাহের সাতটা দিনের নাম দেব-দেবীর নাম থেকে এসেছে। রবি মানে সূর্য দেবতা, সোম মানে চন্দ্র বা শিব, আর ‘মঙ্গলবার’ হচ্ছে মঙ্গল গ্রহ বা হনুমান বা মঙ্গল চণ্ডীর দিন। বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি- এসবই গ্রহ আর দেব-দেবীর নাম। মঙ্গল যদি সাম্প্রদায়িক তকমা নিয়ে বাদ যায়, তবে বৈশাখীও তো বাদ যাওয়ার কথা। কারণ বৈশাখ শব্দটা এসেছে ‘বিশাখা’ নক্ষত্র থেকে। হিন্দু পুরাণ মতে, বিশাখা হলেন দক্ষরাজের কন্যা এবং ব্রহ্মার নাতনি। মঙ্গলকে অর্থাৎ মঙ্গল গ্রহ বা হনুমান বা মঙ্গল চণ্ডীকে সাম্প্রদায়িকতার দাঁড়িপাল্লায় মাপলে বিশাখা আরও বেশি সাম্প্রদায়িক। ‘মঙ্গল’ শব্দটা যদি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে বাদ দেওয়া যায়। ধর্মীয় গ্রন্থে বহুল ব্যবহৃত ‘আনন্দ’ শব্দটাকে সংস্কৃত হওয়ায় বাদ দেওয়া হয়। তবে বৈশাখীও বাদ যাওয়ার কথা। নামকরণের এই ঘনঘন পরিবর্তন আসলে আমাদের জাতীয় জীবনের গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণেরই প্রতিফলন। একদিকে এক পক্ষ মনে করেন, ‘মঙ্গল’ শব্দটি আমাদের হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, এর সাথে ধর্মের কোনো সংঘাত নেই। বরং এটি শুভবোধের প্রতীক। অন্যদিকে, অপর পক্ষ মনে করেন, শব্দের ব্যবহারেও জনমানসের বৃহত্তর অংশের সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত যাতে উৎসবটি সত্যি সত্যি ‘সর্বজনীন’ রূপ পায়। একটি নাম যখন ঐতিহ্যে পরিণত হয়, তখন সেটি আর কেবল শব্দ থাকে না- তা হয়ে ওঠে একটি জাতির পরিচয়। বাঙালি যেদিন থেকে বাঙালিত্ব বাদ দিয়ে ধর্মতত্ত্বকে প্রাধান্য দেওয়া শুরু করেছে সেদিনই নিজেদের মধ্যে বিভক্তি-বিবাদ শুরু হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক মহলে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং ইউনেস্কোর স্বীকৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নিয়ে সংশয় দেখা দিতে পারে। আবার বৈশাখী শোভাযাত্রা নাম করার মাধ্যমে যদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে উৎসবে সামিল করা যায়, তবে তা সামাজিক সংহতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। এই যে ‘মঙ্গল’ থেকে ‘আনন্দ’ এবং শেষমেশ ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’র দিকে ধাবিত হওয়া- এটি কি বিবর্তন নাকি বিচুতি? প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি জাতির সংস্কৃতি যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তার স্বকীয়তা হারিয়ে যায়। বৈশাখী শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের এই দাবিগুলো মূলত এক ধরনের ‘সংস্কৃতিভীতি’ থেকে জন্মেছে। যখন কোনো গোষ্ঠী মনে করে যে একটি বিশেষ শব্দ বা উৎসব তাদের রাজনৈতিক বা ধর্মীয় আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে- তখনই তারা তার নাম বা রূপ বদলাতে চায়। বাঙালির দীর্ঘ লড়াই ছিল ধর্ম ও রাষ্ট্রকে আলাদা রেখে একটি সমন্বিত বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে তোলা। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ- সবখানেই মূলমন্ত্র ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। সাধারণ মানুষের কাছে বড় প্রশ্ন হলো- নাম যা-ই হোক, উৎসবের প্রাণভোমরা কি অক্ষুন্ন থাকছে? মাটির সরা, মুখোশ আর লোকজ বাদ্যের সেই চিরচেনা রূপ কি রাজনৈতিক রঙের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবে? পহেলা বৈশাখ কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা নির্দিষ্ট মতাদর্শের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সাধারণ কৃষকের হালখাতা থেকে শুরু করে নগরের রাজপথের বর্ণিল মিছিল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বৃহৎ ক্যানভাস। মঙ্গল, আনন্দ কিংবা বৈশাখী শোভাযাত্রা- নামের চেয়েও বড় সত্য হলো বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আকাক্সক্ষা। রাজনৈতিক পালাবদলে নামকরণের পরিবর্তন হয়তো প্রশাসনিকভাবে সহজ, কিন্তু মানুষের মন থেকে কোনো সাংস্কৃতিক চেতনা মুছে ফেলা কঠিন। একটি জাতির প্রাণশক্তি নিহিত থাকে তার সংস্কৃতির স্বকীয়তায়। পহেলা বৈশাখ আমাদের সেই স্বকীয়তার ধারক। নাম নিয়ে বিতর্ক কমিয়ে যদি উৎসবের চেতনাকে সমুন্নত রাখা যায়- তবেই তা সার্থক হবে। আশা করা যায়, সব রাজনৈতিক বিতর্ক এবং সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে বাংলা নববর্ষ হয়ে উঠবে সত্যিকারের মিলনের মহামঞ্চ। যেখানে নামের বিভেদ থাকবে না, থাকবে শুধু সম্প্রীতির এক অনন্য বাংলাদেশ। বৈশাখী শোভাযাত্রা বা আনন্দ শোভাযাত্রা অথবা মঙ্গল শোভাযাত্রা- পরিচয় যা-ই হোক, তা যেন বাঙালির অসাম্প্রদায়িক আত্মাকে বিশ্বদরবারে সগৌরবে তুলে ধরে। বাঙালির এই বর্ণিল পদযাত্রাকে রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় বন্দি না করে, একে তার স্বনামে এবং স্বমহিমায় টিকে থাকতে দেওয়াটাই হবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও উদারমনা আচরণ। অন্যথায়, ‘মঙ্গল’ বা ‘আনন্দ’ অথবা ‘বৈশাখী’ হারিয়ে আমরা কেবল একটি প্রাণহীন ‘শোভাযাত্রা’র সাক্ষী হয়ে থাকব- যা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পাতায় কেবল এক করুণ অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হবে। লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

০৮ এপ্রিল ২০২৬