মতামত
স্মৃতির ক্যানভাসে বিস্মৃতির দাগ
:: মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল ::বাঙালির জাতিগত মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তার বিস্মৃতিপ্রবণতা। তীব্র আবেগ এবং দ্রুত সবকিছু ভুলে যাওয়ার এক আত্মঘাতী মানসিকতা এই জনপদের মানুষের মজ্জাগত। ফরাসি দার্শনিক আর্নেস্ট রেনান তাঁর বিখ্যাত ‘হোয়াট ইজ এ নেশন?’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘জাতি গঠনে যেমন যৌথ স্মৃতি প্রয়োজন, তেমনি অনেক কিছু ভুলে যাওয়াও দরকার।’ কিন্তু বাঙালির ক্ষেত্রে এই ‘ভুলে যাওয়া’ কোনো দার্শনিক প্রয়োজন নয় বরং এক রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাধি। যে জাতি রক্তের নদী পেরিয়ে তার অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষা করে, সেই জাতিই কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই রক্তের ঋণ এবং ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা বিস্মৃত হয়। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকবদলে বাঙালির এই বিস্মৃতির ধরণ এবং তার চড়া মূল্য দেওয়ার খতিয়ান বিশ্লেষণ করা বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এক অতীব জরুরি বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণাধর্মী তাগিদ।১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের আত্মত্যাগ বাঙালিকে একটি নতুন ধর্মনিরপেক্ষ জাতিসত্তার পরিচয় দেয়। এই আন্দোলন শুধু ভাষার ছিল না, এটি ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রথম তীব্র সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আঘাত। ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালি রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষার অধিকার ঠিকই আদায় করেছিল, কিন্তু তার মূল চেতনা ধরে রাখতে পারেনি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর যে আইনি ও নৈতিক অঙ্গীকার ছিল, তা আজ দীর্ঘ সাত দশকেও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের উচ্চ আদালত, উচ্চশিক্ষা এবং করপোরেট ও প্রশাসনিক স্তরে বাংলা ভাষার পদাঙ্ক নিশ্চিত করা যায়নি। একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা যে তীব্র আবেগ দেখাই, বছরের বাকি ৩৬৪ দিন তা ইংরেজি বা ভিনদেশি ভাষার আগ্রাসনে হারিয়ে যায়। ভাষা আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ভুলে গিয়ে সমাজ বারবার মৌলবাদ ও সংকীর্ণতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে।১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ছাত্র সমাজের ১১ দফার ভিত্তিতে সংঘটিত হয় এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান। আসাদ, ডক্টর শামসুজ্জোহা, মতিউরের আত্মত্যাগের মুখে আইয়ুব খানের লৌহকঠিন সামরিক জান্তা পতন ঘটাতে বাধ্য হয় এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু সসম্মানে মুক্তি পান। এই আন্দোলন বাঙালিকে শিখিয়েছিল কীভাবে বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে স্বৈরাচারকে বিদায় করতে হয়। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছিল নাগরিক অধিকার ও ফ্যাসিবাদের প্রশ্নে আপসহীন হতে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা দ্রুতই ভুলে যাই আইয়ুবীয় স্টাইলের স্বৈরাচারী ব্যবস্থার কুফল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্রেও বারবার সামরিক শাসন বা বেসামরিক একনায়কতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। যে ছাত্র সমাজ ও জনতা স্বৈরাচারের তখত উল্টে দিয়েছিল, ক্ষমতার পালাবদলের পর তারাই আবার নতুন কোনো শাসকের অন্ধ ভক্তে পরিণত হয়েছে। স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইয়ের মূল মন্ত্র- ‘গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা’ বাঙালি বারবার ভুলে গেছে।১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে শুরু হওয়া গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালি সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং কোটি মানুষের ঘরবাড়ি হারানোর মধ্য দিয়ে এই স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মূল ভিত্তি ছিল তিনটি- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় নিয়ে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল। স্বাধীনতার পর বাঙালির ভুলে যাওয়ার অভ্যাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও বীভৎস বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। যে জাতি কিছুদিন আগেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়েছিল, তারা এক অদ্ভুত জড়তা, উদাসীনতা ও বিস্মৃতির শিকার হলো। এরপর শুরু হলো ইতিহাসের উল্টোরথ যাত্রা। মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নিত ঘাতক-দালাল, রাজাকার ও আলবদরদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পুনর্বাসিত করা হলো; তাদের গাড়িতে ওড়ানো হলো লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত লাল-সবুজ পতাকা। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ঢেকে তরুণ প্রজন্মকে রাখা হলো সত্য থেকে দূরে। সবচেয়ে বড় বিস্মৃতি ঘটল মুক্তিযুদ্ধের মূল আকাক্সক্ষায়- সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাষ্ট্রে এক চরম ক্রনি-ক্যাপিটালিজম বা লুণ্ঠনমূলক অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করা হলো।নয় বছরের সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদ সরকারের পতনের লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে গড়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক গণআন্দোলন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট এবং বামপন্থীদের ৫ দলীয় জোট মিলে ঘোষণা করে ‘তিন জোটের রূপরেখা’। এই রূপরেখার মূল ভিত্তি ছিল- অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, স্বৈরাচারী ও কালো আইন বাতিল এবং টেকসই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা। নূর হোসেন, ডা. মিলনের রক্তের বিনিময়ে ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারের পতন ঘটে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর তিন জোটের সেই ঐতিহাসিক রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ক্ষমতার চেয়ারে বসার পরপরই দলগুলো আবার পরমতসহিষ্ণুতা ভুলে গিয়ে পারস্পরিক প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করে। সংসদকে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে চলে একের পর এক সংসদ বয়কট ও রাজপথের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি। রূপরেখায় যে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা রূপ নেয় দলীয়করণ, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র এবং বিচার বিভাগের টুঁটি চেপে ধরার খেলায়। বাঙালি ভুলে গেল যে, গণতন্ত্র কেবল পাঁচ বছর পর পর ভোট দেওয়ার উৎসব নয়, এটি একটি নিত্যদিনের চর্চা ও সংস্কৃতির নাম।দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা একচ্ছত্র কর্তৃত্ববাদী শাসন, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, গুম-খুন, তীব্র অর্থনৈতিক লুণ্ঠন, মেগা প্রজেক্টের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে দেশে এক চরম ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছিল। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গর্জে ওঠে দেশের ছাত্র-জনতা। কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া এই সংগ্রাম সরকারি বাহিনীর নজিরবিহীন ও নৃশংস দমনপীড়নের মুখে রূপ নেয় এক দফার গণঅভ্যুত্থানে। আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজ, ওয়াসিমসহ শত শত শহীদের আত্মত্যাগ এবং হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ছাত্র-জনতার এই নজিরবিহীন বিজয়কে অভিহিত করা হয় ‘চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে। এই আন্দোলন রাষ্ট্র মেরামতের এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট দেয়।বাঙালির ভুলে যাওয়ার সহজাত অভ্যাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন চলছে। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি ফ্যাসিবাদের স্থায়ী অবসান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল সংস্কার। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আন্দোলনের রক্ত শুকানোর আগেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিষাক্ত লক্ষণগুলো আবার দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয়করণ এবং ভিন্নমতের ওপর চড়াও হওয়ার প্রবণতা সমাজ থেকে পুরোপুরি দূর করা যায়নি। যে তরুণরা বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে নতুন পথ দেখাল, তাদের সেই পবিত্র আত্মত্যাগকে ভুলে গিয়ে সমাজ যদি আবার দলীয় সংকীর্ণতা, সুবিধাবাদ ও মেরুকরণের রাজনীতিতে লিপ্ত হয়, তবে এই গণঅভ্যুত্থানের অর্জনও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। পূর্বসূরিদের মতো চব্বিশের প্রজন্মও যদি ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যায়, তবে তা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও বেদনাদায়ক বিস্মৃতি।ইতিহাসের খতিয়ান ঘাঁটলে দেখা যায়, বাঙালি লড়তে জানে, বুক পেতে রক্ত দিতে জানে, কিন্তু অর্জিত বিজয়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ধরে রাখতে জানে না। এর প্রধান কারণ- আমরা ইতিহাসের আবেগকে সস্তা স্লোগানে রূপান্তর করি, কিন্তু তার গভীর শিক্ষাকে ধারণ করি না। বিজয়ের পর আমরা এক ধরনের সাময়িক আত্মতুষ্টিতে ভুগি এবং দ্রুতই সব ভুলে গিয়ে আবার পুরোনো ভুলের ফাঁদে পা দিই। যদি আমরা ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে আগের আন্দোলনগুলোর মতো বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে দিতে না চাই, তবে আমাদের এই ‘সহজাত ভুলে যাওয়ার রোগ’ থেকে চিরতরে মুক্ত হতে হবে। প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকবদলের শহীদদের স্মৃতি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায়, স্মৃতিসৌধে বা নামফলকে বন্দী না রেখে- তাদের মূল আকাক্সক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতি, সংবিধান ও নাগরিক জীবনে প্রতিফলিত করতে হবে। বাঙালিকে ‘স্মৃতিভুক’ জাতি হওয়া বন্ধ করতে হবে; কারণ যে জাতি বারবার ইতিহাস ভুলে যায়, ইতিহাস তাকে বারবার স্বৈরাচারের শৃঙ্খলে বন্দী করে শাস্তি দেয়।লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
১২ আগস্ট ২০২৬
আলি ব্রাদার্স থেকে সিদ্দিকী ব্রাদার্স
মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল:: ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘ভ্রাতৃদ্বয়’ বা ‘ব্রাদার্স’ পরিভাষাটি যখনই উচ্চারিত হয়, তা কেবল রক্ত সম্পর্কিত দুই ভাইয়ের পরিচয় বহন করে না। তা হয়ে ওঠে শোষণের বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত শক্তির প্রতীক, মুক্তির মিছিলে শামিল দুই নির্ভীক সেনানীর যৌথ লড়াইয়ের আখ্যান। বিশ শতকের ২০-এর দশকে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতে ‘আলি ব্রাদার্স’ এবং ৭০-এর দশকে উত্তাল বাংলাদেশে টাঙ্গাইলের ‘সিদ্দিকী ব্রাদার্স’- উভয় পরিবারই আপন আপন সময়কালে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন। স্থান-কালের ব্যবধান থাকলেও এই দুই কিংবদন্তি ভ্রাতৃদ্বয়ের রাজনৈতিক দর্শন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং আদর্শিক চেতনার মাঝে এক অভূতপূর্ব মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মাওলানা মুহাম্মদ আলি জওহর ও মাওলানা শওকত আলি উচ্চ শিক্ষিত ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা। দুজনেই খিলাফত আন্দোলনের মূল নেতৃবৃন্দের অন্যতম ছিলেন। মুহাম্মদ আলি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। তারা আজীবন দেশের স্বাধীনতার জন্য ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন- যা ইতিহাসে ‘আলি ভ্রাতৃদ্বয়’ বা ‘আলি ব্রাদার্স’ নামে পরিচিত। ভারতের উত্তরপ্রদেশের রামপুরের এক উচ্চবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এই দুই ভাইয়ের (মাওলানা মুহাম্মদ আলি জওহর ও মাওলানা শওকত আলি) শিক্ষা ছিল অক্সফোর্ড ও আলিগড়ের আধুনিকতায় সমৃদ্ধ। কিন্তু তাদের হৃদয়ে ছিল পরাধীনতার গভীর ক্ষত। মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর যখন ১৯১১ সালে ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘কমরেড’ (ঞযব ঈড়সৎধফব) ও উর্দু সাপ্তাহিক ‘হামদর্দ’ প্রকাশ করা শুরু করেন তখনই ব্রিটিশ শাসনের ভিত নড়বড়ে হতে শুরু করে। আলি ব্রাদার্স যখন অবিভক্ত ভারতের রাজনীতিতে আবির্ভূত হন তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর এক চরম সংকটকাল চলছে। ১৯১৯ সালে তুরস্কের খিলাফত ও সা¤্রাজ্য রক্ষার্থে এবং ভারতীয় মুসলমানদের অধিকার আদায়ে তারা ‘খিলাফত আন্দোলন’ শুরু করেন। এটি ছিল ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের ভিত্তিমূলে প্রথম তীব্র আঘাত। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে খিলাফত আন্দোলনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে আলি ব্রাদার্স গোটা উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের এক বাঙালি মুসলিম পরিবার থেকে উঠে আসা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ও কাদের সিদ্দিকীর রক্তে ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের জোয়ার। ষাটের দশকের উত্তাল দিনগুলোতে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তারা যখন রাজপথে নামেন, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল টাঙ্গাইলের মাটি থেকে এক নতুন বিদ্রোহের জন্ম হতে যাচ্ছে। সিদ্দিকী ব্রাদার্স (আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম) যখন বাংলার রাজনীতিতে অবতীর্ণ হন, তখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দুই দশকের শোষণ ও বঞ্চনা চরম সীমায় পৌঁছেছে। ১৯৭০-এর নির্বাচন-উত্তর রাজনৈতিক (ঢ়ড়ষরঃরপধষ) সংকট এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর এই দুই ভাই প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা লতিফ সিদ্দিকী ছিলেন রাজনৈতিক ফ্রন্টের অগ্রনায়ক এবং প্রবাসী সরকারের অন্যতম সংগঠক। আর কনিষ্ঠ ভ্রাতা কাদের সিদ্দিকী গড়ে তোলেন কিংবদন্তিতুল্য ‘কাদেরিয়া বাহিনী’। ১৭ হাজার নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রায় ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের এই বাহিনী টাঙ্গাইলসহ আশপাশের ৯-১০টি জেলার বিশাল অঞ্চলকে কার্যত মুক্তাঞ্চলে পরিণত করেছিল। আলি ব্রাদার্সের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও অগ্নিপরীক্ষার অধ্যায় ছিল তাদের দীর্ঘ কারাবাস ও ঐতিহাসিক ‘করাচি ট্রায়াল’ (১৯২১)। ১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকার তাদের উগ্র রাজদ্রোহিতার অভিযোগে বারবার কারারুদ্ধ করে। ১৯২১ সালের জুলাই মাসে খিলাফত কনফারেন্সে মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর মুসলিম সেনাদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ত্যাগ করার আহ্বান জানান। এই একটি ঘোষণায় ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের ভিত নড়ে ওঠে। এর জের ধরে সেপ্টেম্বর মাসে আলি ব্রাদার্সকে গ্রেপ্তার করে করাচির ঐতিহাসিক ‘খালেকদিনা হলে’ এক বিশেষ সামরিক আদালতে বিচার (কধৎধপযর ঞৎরধষ) শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসকরা তাদের রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে দুই বছরের সশ্রম কারাদ- দেয়। কিন্তু কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ আলি ব্রাদার্সকে দমাতে পারেনি বরং তাদের বন্দিত্বের খবর শুনে পুরো ভারতজুড়ে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। শওকত আলি এবং মোহাম্মদ আলি কারাগারকে বানিয়েছিলেন স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতীক। তাদের মা আবিদা বানু, ইতিহাসে যিনি ‘বি-আম্মা’ নামেই বেশি পরিচিত। মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসসহ তখনকার নেতারা তাকে ‘আম্মা’ সম্বোধন করতেন। তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাকামী একজন মহীয়সী নারী- যিনি স্বাধীনতার জন্য নিজেকে এবং নিজ সন্তানদের উৎসর্গ করেছিলেন। তার মধ্যে কোনো জাতিভেদ ছিল না। তিনিও রাজপথে নেমে স্লোগান দিয়েছিলেন- ‘বোলি আম্মা মোহাম্মদ আলি কী, জান দে দো খিলাফাত পার’। মহীয়সী নারী ‘বি-আম্মা’র কোলে জন্ম নেওয়া দুই ভাইয়ের দীর্ঘ কারাবাসের ত্যাগই ‘আলি ব্রাদার্স’কে উপমহাদেশের আপসহীনতার সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যায়। অন্যদিকে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিদ্দিকী ব্রাদার্সের নেতৃত্বাধীন ‘কাদেরিয়া বাহিনী’ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য এক চরম আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছিল। কাদের সিদ্দিকীকে তারা ‘টাইগার সিদ্দিকী’ বা ‘বাঘা সিদ্দিকী’ নামে ডাকতেন। জ্যেষ্ট ভাই লতিফ সিদ্দিকী যখন ভারতে গিয়ে রাজনৈতিক লবিং ও অস্ত্র সরবরাহের পথ সুগম করছেন, কনিষ্ঠ ভাই কাদের সিদ্দিকী তখন টাঙ্গাইলের বনে-জঙ্গলে থেকে একের পর এক দুঃসাহসিক অপারেশন পরিচালনা করছেন। কাদেরিয়া বাহিনীর সবচেয়ে ঐতিহাসিক অপারেশনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১১ আগস্ট বহমান যমুনার ধলেশ্বরী নদীর মোহনায় চালানো ‘জাহাজ বিধ্বংসী অপারেশন’। পাকিস্তানি বাহিনীর বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও রসদ নিয়ে ‘এসইউএ ইঞ্জিনিয়ারিং এসটি-৩’ এবং ‘এসটি রাজন’ নামের দুটি বিশাল জাহাজ ঢাকার সদরঘাট থেকে যমুনা হয়ে নদী পথে রংপুরের দিকে যাচ্ছিল। ১৯৭১ সালের ১১ আগস্ট টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর অসম সাহসী যোদ্ধারা কমান্ডার হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে যমুনা ও ধলেশ্বরী নদীর মোহনায় পাকিস্তানের অস্ত্র ও রসদ বোঝাই ২টি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করে দেয়। ধ্বংসের আগে মুক্তিযোদ্ধারা জাহাজ ২টি থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ হস্তগত করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঐতিহাসিক এই যুদ্ধ ‘জাহাজমারা যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে দেশের আর কোথাও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা এত বড় ক্ষতির শিকার হয়নি। একইসঙ্গে এই যুদ্ধটিকে মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘোরানো একটি ঘটনা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। এটি ছিল নৌ-যুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম সফল গেরিলা অপারেশন। এছাড়া টাঙ্গাইলের ‘ধলাপাড়া অপারেশন’ এবং ‘মাকরকোল যুদ্ধ’-এ কাদেরিয়া বাহিনীর বীরত্বে পাকিস্তানি সেনারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। কাদের সিদ্দিকী নিজে সম্মুখ সমরে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন এবং একটি অপারেশনে তিনি গুরুতর আহতও হন। লতিফ সিদ্দিকী ও কাদের সিদ্দিকীর এই যৌথ শক্তি ও রণকৌশলের কারণেই ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের আগেই টাঙ্গাইলকে কার্যত মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা সম্ভব হয়েছিল এবং মিত্রবাহিনীর প্যারাশুট ল্যান্ডিংয়ের পথ সহজ হয়েছিল। একই শতকের দুই ভিন্ন যুগের এই দুই ভ্রাতৃদ্বয়ের ঘটনাক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে তাদের মধ্যে আদর্শিক মিলগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে প্রতিভাত হয়- (ক) যৌথ নেতৃত্বের শক্তি: আলি ব্রাদার্স যেমন একজন অসাধারণ বাগ্মী ও লেখক (মুহাম্মদ আলি) এবং অন্যজন দক্ষ সংগঠক (শওকত আলি) হিসেবে পরিপূরক ছিলেন, সিদ্দিকী ব্রাদার্সও তেমনি। লতিফ সিদ্দিকী ছিলেন তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দিকপাল, আর কাদের সিদ্দিকী ছিলেন মাঠপর্যায়ের অকুতোভয় যোদ্ধা ও সেনাপতি। (খ) শোষণের বিরুদ্ধে গণজাগরণ: আলি ব্রাদার্স ভারতের কোণায় কোণায় ঘুরে সাধারণ মানুষকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেছিলেন। একইভাবে সিদ্দিকী ব্রাদার্স টাঙ্গাইলের আপামর জনতাকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন। (গ) অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনা: আলি ব্রাদার্স ধর্মীয় খিলাফত আন্দোলন করলেও তাদের লক্ষ্য ছিল অসাম্প্রদায়িক ও ভারতীয় মুক্তি। তারা গান্ধীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। অন্যদিকে, কাদেরিয়া বাহিনীতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল ধর্মের মানুষ (নারী-পুরুষ) যুদ্ধ করেছে। সিদ্দিকী ব্রাদার্স নিশ্চিত করেছিলেন যে, যুদ্ধকালীন মুক্তাঞ্চলে যেন কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা নিপীড়ন না ঘটে। খেলাফত আন্দোলনের অবিসংবাদিত বাগ্মী নেতা মোহাম্মদ আলি জওহর ও তার বড় ভাই শওকাত আলি ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবেন। মোহাম্মদ আলি জওহর একাধারে রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, কবি ও পন্ডিত ছিলেন। তিনি ১৮৭৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পরাধীন ভারতে না ফেরার শপথ নিয়েছিলেন এবং বিদেশের(লন্ডনের) মাটিতেই ১৯৩১ সালের ৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছানুযায়ী নবীদের পুণ্যভূমি বায়তুল মুকাদ্দাসে তিনি সমাহিত হন। ফিলিস্তিনের তৎকালীন প্রধান মুফতি তার জানাজা পড়িয়েছেন। মোহাম্মদ শওকত আলি ১৮৭৩ সালের ১০ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট দলের অধিনায়কও ছিলেন। ছোট ভাই মুহাম্মদ আলি জওহরের সাথে মিলে তিনি ১৯১৯-১৯২৪ সালের খিলাফত আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৩৬ সালে জীবনের শেষভাগে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৩৮ সালের ২৬ নভেম্বর তিনি দিল্লিতে মৃত্যুবরণ করেন। ইতিহাসের পাতায় আলি ব্রাদার্স ও সিদ্দিকী ব্রাদার্স চিরকাল শোষিত মানুষের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। বিশ শতকের শুরুতে আলি ব্রাদার্স উপমহাদেশে যে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়েছিলেন, সত্তরের দশকে সিদ্দিকী ব্রাদার্স তারই চূড়ান্ত রূপ দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনে। আলি ব্রাদার্স আজ পরলোকগত। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইল জেলা সদরের কাগমারী এলাকায় ‘মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ’ নামে একটি শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মওলানা ভাসানী খিলাফত আন্দোলনের অন্যতম মহান নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহরের স্মরণে ও তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে কলেজটির নামকরণ করেছিলেন। খিলাফত আন্দোলনের অন্যতম দিকপাল ‘আলি ব্রাদার্সে’র স্মরণে জন্ম বা মৃত্যু দিবসে আমরা স্মরণসভা কিংবা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করতে পারি এবং তা অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। এই দুই কিংবদন্তি ভ্রাতৃদ্বয়ের ত্যাগ, সাহস এবং রাজনৈতিক দর্শন প্রমাণ করে যখন কোনো পরিবারের রক্ত শোষণের বিরুদ্ধে একীভূত হয়, তখন তা আর কেবল পারিবারিক বন্ধন থাকে না- তা হয়ে ওঠে একটি জাতির মুক্তির মহাসনদ। জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা আজও তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। ইতিহাসের দীর্ঘ ব্যবধানে এই দুই ‘ব্রাদার্স’ এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছেন- আর সেটি হলো অকুতোভয় দেশপ্রেম। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে টাঙ্গাইলের সিদ্দিকী ব্রাদার্স এবং উপমহাদেশের ইতিহাসে আলি ব্রাদার্সের অবদান তাই সমান্তরাল ও চিরভাস্বর।
৩০ জুলাই ২০২৬
সব শক্তির বড় শক্তি ‘ইচ্ছাশক্তি’
মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল:: মহাবিশ্বের জন্মলগ্ন থেকে আজ অবধি মানুষ শক্তির নানামুখী রূপ দেখেছে। এসব দৃশ্যমান চালিকাশক্তির পেছনে যে অদৃশ্য, অবিনশ্বর এবং মহত্তম শক্তিটি কাজ করে- তা হলো মানুষের ‘ইচ্ছাশক্তি’। ইচ্ছাশক্তি হলো মানবাত্মার সেই অভ্যন্তরীণ স্ফুলিঙ্গ- যা প্রতিকূলতার নিকষ অন্ধকারকে ভেঙে সাফল্যের আলো জ্বেলে দেয়। পৃথিবীতে সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, অস্ত্রের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের সৎ ও সুদৃঢ় ইচ্ছার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। তাই তো বলা হয়- মহাবিশ্বের সব শক্তির বড় শক্তি ইচ্ছাশক্তি। পৃথিবীতে মানব সভ্যতার বিকাশ, উত্থান এবং বিজয়ের পেছনে যে চালিকাশক্তিটি সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে- তা হলো মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি। আদিম গুহাবাসী মানুষ থেকে শুরু করে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মহাকাশ জয়ের যুগে মানুষের শারীরিক বা বস্তুগত সীমাবদ্ধতা অনেক ছিল। কিন্তু মানুষ তার ভেতরের এক অদৃশ্য, অবিনশ্বর শক্তির জোরে জয় করেছে জল-স্থল আর অন্তরীক্ষ। সেই আদিমকাল থেকে আজ অবধি একটি চিরন্তন সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে- জগতের সব শক্তির চেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের ভেতরের ‘ইচ্ছাশক্তি’। বিশ্বের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক, দার্শনিক ও চিন্তাবিদরা যুগে যুগে ইচ্ছাশক্তির এই অপার মহিমাকে তাদের লেখনিতে তুলে ধরেছেন। ফরাসি ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগো মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে বলেছেন, ভেতরের ইচ্ছের প্রদীপটি নিভে না গেলে বাহ্যিক কোনো প্রতিকূলতাই মানুষকে থামাতে পারে না। জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিশ নিটশে তার ‘দ্যা উইল টু পাওয়ার’ (The Will to Power) ধারণায় দেখিয়েছেন, জগতের সমস্ত চালিকাশক্তির মূলে রয়েছে এক প্রবল ইচ্ছাবোধ। মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলনের পুরোধা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, ‘যদি তুমি উড়তে না পারো তবে দৌড়াও, যদি দৌড়াতে না পারো তবে হাঁটো, যদি হাঁটতে না পারো তবে হামাগুড়ি দাও; কিন্তু তোমাকে সামনে এগিয়ে যেতেই হবে।’- এই এগিয়ে যাওয়ার নিরন্তর তাগিদটাই হলো ইচ্ছাশক্তি। মহাত্মা গান্ধী ইচ্ছাশক্তিকে শারীরিক বা সামরিক শক্তির চেয়ে অনেক ওপরে স্থান দিয়ে বলেছেন, ‘শক্তি শারীরিক সামর্থ্য থেকে আসে না। এটি আসে একটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি থেকে।’ পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনও মনে করতেন, ‘ইচ্ছাশক্তি হলো এমন একটি চালিকাশক্তি যা বাষ্প, বিদ্যুৎ এবং পারমাণবিক শক্তির চেয়েও শক্তিশালী।’ ইচ্ছাশক্তির জোর বোঝাতে প্রকৃতি ও ইতিহাসের চেয়ে বড় কোনো উপমা হতে পারে না। একটি ছোট্ট বীজ যখন পাথরের বুক চিরে অংকুরিত হয়ে বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়- তখন সেই পাথরের কাঠিন্য হেরে যায় বীজের ভেতরের লুকিয়ে থাকা প্রবল জীবন-ইচ্ছার কাছে। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা ঝরনাধারা প্রমাণ করে- অবিচল লক্ষ্য আর বয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে কঠিন পাথরও পথ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ব্যক্তি জীবনেও আপনি যদি কোনো গুরুতর সমস্যায় পড়েন, দেখবেন বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের ওষুধের চেয়ে পরামর্শ বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে। আবার বিশেষজ্ঞ-ডাক্তার-ওষুধের পরও যদি আপনার মন দুর্বল থাকে, তাহলে সমস্যা উৎরানো কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ মানসিকভাবে যদি আপনি ভাবেন এ সমস্যাটা আপনার জন্য কিছুইনা, এরচেয়ে অনেক বড় বড় সমস্যা সমাধান করেছেন- এটা তো নস্যি। দেখা যায়- সমস্যাটা আর সমস্যা থাকেনা, কাজে পরিনত হয় এবং সমাধান হয়ে যায়। ইতিহাসের পাতায় তাকালে আমরা দেখি নেলসন ম্যান্ডেলাকে। সাতাশ বছরের দীর্ঘ কারাবাস, বর্ণবাদী সরকারের নির্মম নির্যাতন- কোনো কিছুই তার ভেতরের মুক্তিকামী ইচ্ছাশক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। রবেন দ্বীপের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেও তিনি যে স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন, তার ইচ্ছাশক্তির জোরেই তা একদিন দক্ষিণ আফ্রিকার আকাশে স্বাধীনতার সূর্য হয়ে উদিত হয়েছিল। আমরা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথাই যদি ধরি, টমাস আলভা এডিসন হাজার বার ব্যর্থ হয়েও বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছিলেন। তার এই হাজার বার ব্যর্থতাকে হারিয়ে দিয়েছিল তার একক ইচ্ছাশক্তি। একইভাবে, শারীরিক পক্ষাঘাতগ্রস্ততা সত্ত্বেও স্টিফেন হকিং মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করেছেন কেবল তার মস্তিষ্কের অদম্য ইচ্ছার জোরে। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ইচ্ছাশক্তির সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও রক্তস্নাত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। তৎকালীন সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ছিল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত, সুপ্রশিক্ষিত এবং সংখ্যায় বিশাল। তাদের বিপরীতে বাংলার সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক আর ছাত্রসমাজ ছিল প্রায় নিরস্ত্র। সামরিক শক্তির সেই চরম অসন্তুলনের মাঝেও বাঙালি যে একটি সুসজ্জিত নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিল, তার একমাত্র জ্বালানি ছিল- স্বাধীনতার তীব্র ইচ্ছাশক্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো’ এবং ‘আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’- এই অমোঘ বজ্রবাণী মূলত কোটি বাঙালির অবদমিত ইচ্ছাশক্তিকে এক লহমায় জাগিয়ে তুলেছিল। থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, বাঁশের লাঠি আর অকুতোভয় বুক নিয়ে এ দেশের দামাল ছেলেরা যখন পাকিস্তানি আধুনিক ট্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়েছিল, তখন বস্তুগত শক্তি পরাজিত হয়েছিল মানসিক শক্তির কাছে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ আর ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা প্রমাণ করে- পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য ইচ্ছার কাছে পৃথিবীর যেকোনো আধুনিক ও নিষ্ঠুর মেলেটারি ফোর্সও নতিস্বীকার করতে বাধ্য। একাত্তরের সেই অবিনাশী ইচ্ছাশক্তির এক অভূতপূর্ব পুনরাবৃত্তি ও পুনর্জাগরণ আমরা দেখতে পেয়েছি ১৯৯০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর ও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, রাষ্ট্রীয় শাসনযন্ত্রের নিপীড়ন, দুর্নীতি এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় রাস্তায় নেমে এসেছিল- তখন এক নতুন ইতিহাস রচিত হয়। ২০২৪-এর এই আন্দোলন কেবল একটি কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি রূপ নিয়েছিল রাষ্ট্র সংস্কার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক ইস্পাতকঠিন গণদাবিতে। রাষ্ট্রশক্তির বন্দুকের নল, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল আর শত শত প্রাণের আত্মদানও দমাতে পারেনি তরুণ প্রজন্মের সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে। আবু সাইদ যখন বুক পেতে রাষ্ট্রযন্ত্রের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন সেই দৃশ্যটি হয়ে উঠেছিল অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক কালজয়ী প্রতীক। বন্দুকের গুলি যেখানে তরুণদের ঘরে ফিরিয়ে দিতে পারেনি, সেখানেই প্রমাণিত হয়েছে- পেশীশক্তি বা অস্ত্রের চেয়ে মানুষের ন্যায়বিচারের আকাক্সক্ষা ও ইচ্ছাশক্তি কতখানি শক্তিশালী। সাধারণ নাগরিক, নারী, শিশু এবং আপামর শ্রমজীবী মানুষের এই অভূতপূর্ব স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং সম্মিলিত ইচ্ছার জোয়ারে একটি দীর্ঘমেয়াদী স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বিশ্ববাসীকে টেক্সটবুক উদাহরণের মতো দেখিয়ে দেয়- একটি জাতির সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি জাগ্রত হলে যেকোনো স্বৈরশাসন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন আমরা বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করি, তখন এই ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হয়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সময়ে আমরা এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। সমাজ এখন এক নতুন উদ্দীপনা, রাষ্ট্র সংস্কারের আকাক্সক্ষা, একই সাথে এক ধরণের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তরুণ সমাজ আজ যে ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছে, তা বাস্তবায়নে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামষ্টিক ও সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তি। সামাজিক অবক্ষয়, মাদক, সাইবার অপরাধ এবং দীর্ঘদিনের জঞ্জাল দূর করতে কোনো আইন বা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম ততটা কাজ করবে না, যতটা কাজ করবে মানুষের ভেতর থেকে জেগে ওঠা শুদ্ধ সামাজিক চেতনা ও পরিবর্তনের তীব্র ইচ্ছা। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে আজ ক্ষমতার দ্ব›দ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ আর অর্থনৈতিক মন্দার কালো মেঘ। এই পরিস্থিতিতে আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ‘রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইচ্ছাশক্তি’ (Political and Administrative Will)। দুর্নীতিমুক্ত, সমতাভিত্তিক এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের যে অঙ্গীকার ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তি ক্ষমতাসীন হয়েছে- তা ধরে রাখতে হলে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে সততা এবং দেশপ্রেমের ইচ্ছাশক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণআন্দোলন এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান- আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকবদলের মূল হাতিয়ারই ছিল এই সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাশক্তি হলো মানুষের মনের সেই জাদুকরী আলো- যা অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষপ্রান্তেও আশার পথ দেখায়। বাহ্যিক সম্পদ, অর্থ বা পেশীশক্তি সাময়িক জয় এনে দিতে পারে, কিন্তু চিরস্থায়ী পরিবর্তন ও ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী আসন কেবল ইচ্ছাশক্তির জোরেই অর্জন করা সম্ভব। কবি কৃষ্ণ চন্দ্র মজুমদার যথার্থই লিখেছিলেন, ‘যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, আশুগৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ ভাতি।’ অর্থাৎ, শক্তির সঠিক ব্যবহার ও ভেতরের সদিচ্ছাই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। আবার কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষের সেই অমর বাণী আজো আমাদের কানে অনুরণিত হয়- ‘পারিব না এ কথাটি বলিও না আর/কেন পারিব না তাহা ভাব একবার...’ ব্যক্তিগত জীবনের হতাশা, সামাজিক অবক্ষয় আর রাজনৈতিক অস্থিরতার এই ক্রান্তিকালে আমাদের নতুন করে ইচ্ছাশক্তির চর্চা করতে হবে। সকল নেতিবাচকতাকে পেছনে ফেলে, আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে ‘আমি পারব, আমাদের পারতেই হবে’- এই মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ, পৃথিবীতে সাম্রাজ্যের পতন ঘটে, প্রযুক্তির সংস্কার হয়, কিন্তু মানুষের অজেয় ইচ্ছাশক্তি চিরকাল অপরাজেয় ও অমর হয়ে থাকে। তাই ৭১-এর চেতনা আর ২৪-এর রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থানের উত্তরাধিকারী হিসেবে আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত এই অদম্য ইচ্ছাশক্তির চাষ করতে হবে। কারণ, ইচ্ছা যেখানে বলবান, পথ সেখানে উন্মুক্ত হতে বাধ্য। সব শক্তির সেরা শক্তি এই ইচ্ছাশক্তিকে বুকে ধারণ করেই বাঙালি জাতিকে এগিয়ে যেতে হবে এক বৈষম্যহীন, সাম্যবাদী ও আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে।
১৩ জুন ২০২৬
নীরবে ঝরে পড়া শৈশব :: দারিদ্র্য কীভাবে শিশুকে বিদ্যালয় ছেড়ে যেতে বাধ্য করে
শরীফা হক:: বৈশ্বিক শিক্ষা সংস্কার, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পাঠদান নিয়ে যখন উৎসবমুখর আলোচনা চলছে, তখন একটি নিষ্ঠুর নীরবতা চেপে বসে থাকে- সেই লক্ষশিশুর নীরবতা, যারা দারিদ্র্যের নির্মম নিষ্পেষণে বইখাতা ফেলে চিরতরে স্কুলের আঙিনা থেকে বিদায় নেয়। একেই বলে "নীরবে ঝরে পড়া"। নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে না। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়- এটি একটি ব্যর্থতার দলিল, একটি স্বপ্নের মৃত্যু। এই ট্র্যাজেডি কেবল ব্যক্তিগত নয়। এটি জাতীয় মানবসম্পদের অপচয়, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পায়ে বাঁধা সবচেয়ে ভারি শিকল। ১৯৯০ সালে বৈশ্বিক প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ, যা ২০২০-এর দশকে ৯১ শতাংশ ছাড়িয়েছে- পরিসংখ্যানে এটি অগ্রগতির চিত্র। কিন্তু ভর্তি হওয়া আর শিক্ষা সমাপ্ত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। ইউনেস্কোর ২০২৫ সালের বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ২৭২ মিলিয়ন শিশু ও কিশোর বিদ্যালয়ের বাইরে, যা আগের অনুমানের তুলনায় ২১ মিলিয়ন বেশি। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সী (৬-১১ বছর) শিশু রয়েছে ৭৮ মিলিয়ন। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার আগেই ঝরে পড়ে। সাব-সাহারান আফ্রিকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ; সেখানে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত- যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের চিত্র বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ; এটি একটি প্রশংসনীয় অর্জন। অথচ সমাপনী হার এখনো ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ১৫–২০ শতাংশ শিশু পঞ্চম শ্রেণির সনদ অর্জনের আগেই স্কুলের আঙিনা ছেড়ে বিদায় নেয়। ভর্তি ও সমাপনীর এই ব্যবধানটিই প্রমাণ করে যে শুধু স্কুলে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়- শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্যের বহুমাত্রিক ফাঁদ দারিদ্র্য কেবল অর্থের অভাব নয়; এটি একটি জটিল ও আন্তঃসম্পর্কিত প্রতিবন্ধকতার জাল, যার প্রতিটি সুতো শিশুকে শিক্ষা থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। দারিদ্র্য কিভাবে শিশুদের স্কুলছুট করে, তা বোঝার জন্য এর বহুমাত্রিক প্রভাব বিশ্লেষণ জরুরি। শিশুশ্রম ও সুযোগ ব্যয়ঃ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ও ইউনিসেফের ২০২৪ সালের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে ৫৪ মিলিয়ন বিপজ্জনক কাজে নিযুক্ত । দরিদ্র পরিবারের কাছে একটি শিশু শুধু সন্তান নয়, সম্ভাব্য আয়ের উৎস। স্কুলের পরিবর্তে সে কৃষি, কারখানা বা গৃহকাজে যোগ দেয়। স্কুলে যাওয়া মানে একদিনের রোজগার হারানো- এই তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতির হিসেবে শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি অনেক ক্ষেত্রে হেরে যায়। শিক্ষার প্রচ্ছন্ন ব্যয়ঃ সরকারিভাবে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও খাতা, কলম, স্কুল পোশাক, যাতায়াত এবং প্রাইভেট টিউশনের খরচ মিলিয়ে শিক্ষা দরিদ্র পরিবারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় । বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন-আয়ের পরিবারের মোট আয়ের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত এই পরোক্ষ শিক্ষাব্যয়ে চলে যায়। এসব “লুক্কায়িত ব্যয়” অনেক পরিবারকে সন্তানদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করে। ক্ষুধা ও অপুষ্টিঃ ইউনিসেফের গবেষণা বলছে, অপুষ্ট শিশুদের অনুপস্থিতি বেশি, মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা দুর্বল এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যের মতো মৌলিক চাহিদার অভাব শিক্ষাকে পেছনে ফেলে। বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলের মতো কর্মসূচি এই সমস্যার আংশিক সমাধান হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা এখনো অপ্রতুল। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যঃ দারিদ্র্যের আঘাত কন্যাশিশুদের ওপর দ্বিগুণভাবে পড়ে। নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোতে পুত্রসন্তানের শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেয়া হলেও মেয়েশিশুকে গৃহস্থালি কাজ বা বাল্যবিবাহের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা এখনো অনেক বেশি। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় এই প্রবণতা স্পষ্ট। অনিরাপদ যাতায়াত ও পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের অভাবও কন্যাশিশুদের ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। শিক্ষার নিম্নমানঃ অপর্যাপ্ত শিক্ষক, দুর্বল অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ ও আনন্দের সাথে শিক্ষা কার্যক্রমের অভাবেও শিশুরা স্কুল থেকে আগ্রহ হারায়। ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট জানাচ্ছে, নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৭০ শতাংশ দশ বছর বয়সী শিশু একটি সহজ গল্প পড়ে বুঝতে পারে না- এটিকে বলা হয় "শিক্ষণ দারিদ্র্য" বা Learning Poverty। যখন অভিভাবকরা দেখেন যে বছরের পর বছর স্কুলে গিয়েও শিশু কোনো কাজের দক্ষতা অর্জন করছে না, তখন তারা যুক্তিসংগতভাবেই শিশুকে স্কুল থেকে তুলে নেন। বাংলাদেশের স্থানীয় বাস্তবতা বাংলাদেশে ব্যানবেইস ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বিদ্যালয় ত্যাগের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিভাবকের আর্থিক অসচ্ছলতা (প্রায় ৪০% ক্ষেত্রে), ছেলেদের আয়-উপার্জনের চাপ এবং মেয়েদের গৃহস্থালির কাজে নিয়োগ। উপকূলীয় ও হাওর-বেষ্টিত এলাকায় মৌসুমী অভিবাসন শিশুদের শিক্ষায় বারবার ছেদ ফেলে, যা একসময় স্থায়ী ঝরে পড়ায় রূপ নেয়। পোশাকশিল্প ও কৃষিতে শিশুশ্রম এবং নদীভাঙন এলাকার বিশেষ ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য। উপবৃত্তি কর্মসূচি পরিস্থিতির উন্নতিতে সহায়তা করেছে; তবে গ্রামীণ, চরাঞ্চল ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ে এখনো বড় ফাঁক রয়ে গেছে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ১৯৯০ সালে ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৯০ শতাংশে। কিন্তু ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে প্রবেশকারীদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার ২০০৯ সালের ৪২ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ২১ শতাংশে নেমে এলেও, প্রত্যন্ত ও দরিদ্র অঞ্চলে প্রাথমিক স্তর শেষ না করেই ঝরে পড়ার হার রয়ে গেছে উল্লেখযোগ্য । দারিদ্র্য, মৌসুমি অভিবাসন ও শিশুশ্রম (বিশেষত কৃষি ও পোশাকশিল্পে) এখানে অন্যতম বাধা । স্কুল থেকে ঝরে পড়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশাল। ইউনেস্কোর “দ্য প্রাইস অফ ইন্যাকশন” বলছে- ২০৩০ সালের মধ্যে মৌলিক দক্ষতাহীন ও ঝরে পড়া শিশুদের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি বছরে হারাবে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ফ্রান্স ও জাপানের জিডিপির চেয়েও বেশি। ঝরে পড়া মাত্র ১০% কমালেই বার্ষিক জিডিপি বাড়বে ১-২%। বিশ্বব্যাংকের হিসাব, শিক্ষার অতিরিক্ত এক বছর আয় বাড়ায় ৯-১০%। অথচ ঝরে পড়া শিশুরা আটকে যায় নিম্ন আয়, দুর্বল স্বাস্থ্য আর দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে- যা পরবর্তী প্রজন্মেও বয়ে যায়। জাতীয়ভাবে এর ফল; ধীর জিডিপি বৃদ্ধি, থেমে যাওয়া উদ্ভাবন আর ভঙ্গুর সামাজিক স্থিতি। সংকট উত্তরণে করণীয় সমাধানের জন্য দরকার সমন্বিত বহুমুখী পদক্ষেপ। শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা ও উপবৃত্তি বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর মধ্যাহ্নভোজ (স্কুল ফিডিং) কর্মসূচি, লিঙ্গসংবেদনশীল অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, জীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক পাঠ্যক্রম ও আনন্দের সাথে শিক্ষা- এই পদক্ষেপগুলো একত্রে কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষতঃ দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য শর্তসাপেক্ষ উপবৃত্তি ও নগদ সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে, যেন শিক্ষার প্রচ্ছন্ন ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়। ক্ষুধামুক্ত শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী "মিড-ডে মিল" অত্যন্ত কার্যকর, যা শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে যাদুর মতো কাজ করে। পাশাপাশি শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য। শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিউনিটি মনিটরিং জোরদার করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে শিশুবান্ধব ও কর্মমুখী করা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অর্থায়নে শিক্ষা নিশ্চিত করা; আনুষঙ্গিক শিক্ষা ব্যয় হ্রাস করা এবং নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা- বিশেষত মেয়েশিশুদের জন্য আলাদা স্যানিটেশন ও নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নীরবে ঝরে পড়া কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়- এটি বৈষম্য ও দারিদ্র্যের প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শুধু ভর্তি নিশ্চিত করলেই চলবে না; প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রেখে প্রাথমিক শিক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে হবে। কারণ একটি শিশুর ঝরে পড়া মানে শুধু একটি ফাঁকা বেঞ্চ নয়-একটি সম্ভাবনার মৃত্যু, একটি জাতির ভবিষ্যতের ক্ষয়। এই নীরবতা ভাঙতে এখনই দরকার সমন্বিত, জোরালো পদক্ষেপ।
০৭ জুন ২০২৬
বাংলাদেশকে রীতিমতো ‘বেচে’ দিয়েছেন ড. ইউনূস!
দৃষ্টি রিপোর্ট: শেখ হাসিনার পতনের ঠিক ৩ দিনের মাথায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন নিজের হাতে দেশের ক্ষমতা তুলে নিলেন, সবাই ভেবেছিলেন—অবশেষে বেঁচে গেল বাংলাদেশ! এবার শুধু এগিয়ে যাওয়ার পালা। কিন্তু মানুষের সেই স্বপ্ন যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকল! বিদায়ের ঠিক কয়েকদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান যা করে গেলেন; বিশ্লেষকদের মতে- বাংলাদেশের ইতিহাসের কোনো শাসক এমনটা করেননি। স্পষ্ট করে বলতে গেলে দেশের এমন সর্বনাশ কেউ করেনি বলেই মত বিশ্লেষকদের। ড. ইউনূসের দেড় বছরের শাসনামলে নেওয়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) নামের একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। চুক্তির শর্ত, ভাষাগত কাঠামো এবং দুই দেশের বাধ্যবাধকতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এতে বাংলাদেশের বাজারে কিছু খাতে শুল্ক ছাড়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে নীতি-স্বাধীনতার ওপর চাপও বাড়তে পারে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি করে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। চুক্তিটির নাম অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)। বাংলায় এর অর্থ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি। ‘রিসিপ্রোকাল’ শব্দটির অর্থ হলো, দুই পক্ষের মধ্যে সমান আদান-প্রদান। সমতার ভিত্তিতে দেওয়া-নেওয়ার কথা বলা হলেও, ৩২ পৃষ্ঠার দলিলটি হাতে নিয়ে একবার পাতা উল্টালেই চোখ কপালে ওঠার মতো অনেক বিষয় সামনে আসে! দেশে তখন নির্বাচনের হাওয়া। ড. ইউনূসের সরকার বিদায় নিতে যাচ্ছে। ঠিক সেই সময়েই নিঃশব্দে দেশের ভবিষ্যৎকে একটি চুক্তির ভেতরে বেঁধে দিয়ে যাওয়া হয়। যখন দেশের মানুষ বিষয়টি টের পেল, ততক্ষণে যা হওয়ার, তা হয়ে গেছে! এই চুক্তির ভেতরের বিষয় বুঝতে হলে আগে একটি সহজ ব্যাকরণ বুঝতে হবে। ইংরেজি আইনি ভাষায় ‘শ্যাল’ মানে বাধ্যতামূলক, অর্থাৎ এটি করতেই হবে। আর ‘উইল’ মানে ইচ্ছাধীন, চাইলে করা যাবে, না চাইলে বাধ্যবাধকতা নেই। ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তিতে ‘শ্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে মোট ১৭৯ বার, আর ‘উইল’ এসেছে মাত্র তিনবার। এখন প্রশ্ন হলো, বাধ্যবাধকতার ভার কার কাঁধে বেশি পড়েছে? চুক্তির এই ১৭৯টি ‘শ্যাল’-এর মধ্যে বাংলাদেশের ওপর বাধ্যবাধকতা এসেছে ১৩১ বার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ‘শ্যাল’ ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র ছয়বার। অর্থাৎ এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে ১৩১টি ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে শর্ত মানতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য থাকবে মাত্র ছয়টি ক্ষেত্রে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটাই তথাকথিত ‘পারস্পরিক’ চুক্তির আসল চেহারা। তাদের মতে, এটি আসলে কোনো সমতার চুক্তি নয়; বরং একটি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দলিলের নমুনা। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে কী কী করতে হবে, সেই তালিকা এত দীর্ঘ যে পুরোটা বলতে গেলে আলাদা একটি বই হয়ে যাবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের জন্য বাংলাদেশের বাজারে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। মার্কিন গাড়ি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অনুমোদন বা কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চাওয়া যাবে না। এ ছাড়া মার্কিন ডিজিটাল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক কর আরোপ করা যাবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশীয় উৎপাদকদের এমন কোনো ভর্তুকি দিতে পারবে না, যেন মার্কিন পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমে যায়। এমনকি পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি রড কেনার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন ডিসির পছন্দের বাইরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে। আর যদি বাংলাদেশ ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে নতুন বড় বাণিজ্য চুক্তি করে এবং তাতে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে তাদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাহলে ওয়াশিংটন ডিসি পুরো এআরটি চুক্তি বাতিল করে আগের শাস্তিমূলক শুল্ক পুনর্বহালের ক্ষমতা রাখবে। অর্থাৎ চুক্তিটিও এক ধরনের শর্তসাপেক্ষ ‘অনুগ্রহ’ হিসেবেই কার্যকর থাকবে। এত কিছুর বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেল? মূলত পোশাক ও বস্ত্র খাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য বা কম শুল্কে প্রবেশের সুযোগ। তবে সেটিও নিঃশর্ত নয়। এই সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশকে আমেরিকা থেকেই তুলা, কৃত্রিম তন্তু এবং বিভিন্ন বস্ত্র উপকরণ আমদানি করতে হবে। যত বেশি আমদানি করা হবে, তত বেশি সুবিধা মিলবে। অর্থাৎ সুবিধা পেতে হলেও নির্ভর করতে হবে তাদের ওপরই। গবেষণা সংস্থা সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশকে ৭১৩২টি মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক প্রায় পুরোপুরি তুলে দিতে হবে। এর মধ্যে ৪৯২২টি পণ্যের ক্ষেত্রে চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে। ফলে বড় ধরনের রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ। ফলে একদিকে বাংলাদেশকে বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে, অন্যদিকে নীতিনির্ধারণেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মেনে চলার চাপ তৈরি হবে। এককথায়, লাভ সামান্য হলেও ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। একই দিনে অর্থাৎ নির্বাচনের মাত্র ৬০ ঘণ্টা আগে, আরও একটি বড় চুক্তি সই হয়। সেটি হলো বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় চুক্তি করা সরাসরি আইনের লঙ্ঘনের শামিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১ মে চুক্তি অনুযায়ী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আনুষ্ঠানিকভাবে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করে। এসব উড়োজাহাজ কিনতে ব্যয় হবে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম উড়োজাহাজটির সরবরাহ শুরু হতে পারে ২০৩১ সালের অক্টোবর থেকে। এরপর ধাপে ধাপে ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো বহর হস্তান্তরের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই চুক্তি নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা চলছে। অনেকের মতে, বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে, যখন বাংলাদেশ নিজেই অর্থসংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে, তখন এত বড় অঙ্কের চুক্তি বাস্তবতাবিবর্জিত সিদ্ধান্ত বলেই মনে হচ্ছে। অসম বাণিজ্য চুক্তি বা উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ই মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের একমাত্র সমালোচিত অধ্যায় নয়। তার শাসনামলে এমন এক ব্যর্থতার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা সরাসরি শত শত শিশুর জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতায় আসার পর সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে হামের টিকা কেনার পুরনো ব্যবস্থা পরিবর্তন করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে সরকার উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ইউনিসেফ আগেই সতর্ক করেছিল, এই পথে গেলে টিকা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তায় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফল হিসেবে হাম-রুবেলার টিকার মজুদ ফুরিয়ে যায়। সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দিতে হয়, এমনকি একটি কর্মসূচি পুরোপুরি বাতিলও করা হয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। বাকি ৪১ শতাংশ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়। আর এর ভয়াবহ পরিণতি দেশ দেখতে শুরু করে ২০২৬ সালে এসে। মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে পাঁচ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে চার শতাধিক শিশু। ঢাকা সংক্রামক রোগ হাসপাতালে শিশু রোগীতে উপচে পড়ছে। বেড না থাকায় অনেককে মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সরাসরি সতর্ক করে বলেছে, টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের কয়েক দশকের অর্জন এখন ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। আর আইইডিসিআরের সাবেক উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেছেন, শুধু টিকার ঘাটতিই নয়, এই সংকট দেশের গভীরে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতারও প্রতিফলন। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছে যে জনস্বাস্থ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবিও উঠেছে। একসময় যে দেশে হাম সংক্রমণ প্রায় বিরল হয়ে গিয়েছিল, সেখানে মুহাম্মদ ইউনূসের দেড় বছরের শাসনামলে পরিস্থিতি আবার মহামারির রূপ নিয়েছে, এমন অভিযোগ তুলছেন সমালোচকরা। এখন প্রশ্ন উঠছে, ড. ইউনূসের এই দেড় বছরের শাসনে বাংলাদেশের প্রকৃত অর্জন কী? সেই প্রশ্নের উত্তর দীর্ঘ করে দেওয়াও কঠিন। কারণ বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এই দেড় বছরে উল্লেখ করার মতো বড় কোনো অর্জন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে গেছে, সেই হিসাব দেখেই তারা বিস্মিত হচ্ছেন। তাদের মতে, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার জাতির সঙ্গে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কোটি মানুষের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির পথে হাঁটতে গিয়ে দেশকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগই তুলছেন সমালোচকরা। এখন সবার নজর নতুন সরকারের দিকে। তারা এই সংকট থেকে দেশকে কতটা টেনে তুলতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সূত্র: বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরডটকম
২১ মে ২০২৬
“আদর্শের লড়াই হয় বুদ্ধিবৃত্তিক”
:: মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল :: সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিবর্তনের ইতিহাসে আজ আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় শক্তির সংজ্ঞায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। পেশিবল কিংবা মারণাস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে আজ আর কোনো জনপদকে দীর্ঘস্থায়ী শাসন করা সম্ভব নয়। ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখেছি, আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে চেঙ্গিস খান পর্যন্ত- সবাই তলোয়ারের মাধ্যমে ভূমি জয় করেছিলেন, কিন্তু মানুষের হৃদয় ও চেতনা জয় করতে পারেননি। এখানেই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের অপরিহার্যতা সামনে আসে। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছিলেন, ‘কলম তলোয়ারের চেয়ে শক্তিশালী’। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এই উক্তিটি কেবল আলঙ্কারিক নয় বরং এক কঠোর ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আদর্শের লড়াইটা আর ময়দানে নয় বরং হয়ে উঠেছে গভীরতর বুদ্ধিবৃত্তিক। একটি আদর্শ তখনই সমাজ ও রাষ্ট্রে শিকড় গেড়ে বসে, যখন তা যুক্তির নিক্তিতে উত্তীর্ণ হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক এই লড়াইয়ের মূল হাতিয়ার হলো জ্ঞান, তথ্য এবং বিশ্লেষণ। বর্তমান বিশ্বে আমরা দেখছি ‘সফট পাওয়ার’ বা নরম শক্তির জয়জয়কার। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ নাই এই ধারণার প্রবর্তক। তার মতে, একটি রাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নয় বরং তার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আদর্শ এবং পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে অন্য দেশের মন জয় করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, গত এক দশকে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের মোট বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় করছে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রসারে। ইউনেস্কোর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের জিডিপির প্রায় ২.৫% থেকে ৪.৫% পর্যন্ত গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে ব্যয় করে। এটি প্রমাণ করে তারা জানে, আগামির বিশ্ব শাসন করবে তারাই, যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত মজবুত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও আদর্শিক সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। আমরা প্রায়ই দেখি, রাজপথে স্লোগান আর পাল্টাপাল্টি হুঙ্কার দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এতে সাময়িক বিজয় এলেও দীর্ঘমেয়াদী কোনো আদর্শিক পরিবর্তন আসে না। আদর্শের লড়াই হওয়া উচিত টেবিল-টক, সেমিনার, পত্রিকার সম্পাদকীয় কলাম এবং সুস্থ বিতর্কের মাধ্যমে। যখন একটি গোষ্ঠী কেবল পেশিশক্তির ওপর নির্ভর করে তাদের মতবাদ চাপিয়ে দিতে চায়, তখন সমাজে অসহিষ্ণুতা ও চরমপন্থা জন্ম নেয়। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অভাব রয়েছে এবং যেখানে মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ, সেখানেই চরমপন্থা সবচেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়েছে। অর্থাৎ, তলোয়ার দিয়ে নয়, ভুল আদর্শকে মোকাবিলা করতে হয় সঠিক যুক্তি ও উন্নততর আদর্শ দিয়ে। একটি আদর্শের জয়যাত্রা অনেকটা প্রবহমান নদীর মতো। নদী যেমন তার চলার পথে পাহাড়-পাথরকে সরিয়ে দেয় না বরং নিজের গতিপথ তৈরি করে নেয়, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইও ঠিক তেমনি। এখানে প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নির্মূল করার চেয়ে তার চিন্তাধারাকে যুক্তির মাধ্যমে ভুল প্রমাণ করাটাই আসল বিজয়। ইমাম গাজ্জালি থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্স কিংবা গ্রামশি- সবার দর্শনেই আমরা দেখি, তারা তাদের সমসাময়িক ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন। আন্তোনিও গ্রামশি তার ‘হেজেমনি’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, শাসক গোষ্ঠী কেবল পুলিশ বা সেনাবাহিনী দিয়ে শাসন করে না বরং তারা শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে জনমানুষের ওপর এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য কায়েম করে। তাই যারা বিকল্প আদর্শের কথা বলেন, তাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো একটি সবল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতি-কাঠামো গড়ে তোলা। আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের নতুন ক্ষেত্র হলো ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ ও ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’। স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ বিলিয়নের বেশি মানুষ ইন্টারনেটে সক্রিয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সামনে তথ্য ও অপতথ্যের এক মহাসমুদ্র। এখানে প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি টুইট এবং প্রতিটি লেখা এক একটি আদর্শিক লড়াইয়ের অংশ। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে যুক্তির চেয়ে আবেগ এবং সত্যের চেয়ে মিথ্যার প্রচার অনেক দ্রুত ঘটছে। এমআইটি-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সত্য খবরের তুলনায় ভুয়া খবর ৬ গুণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিকূল পরিবেশে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াকুদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। কেবল আবেগ দিয়ে নয় বরং গভীর পঠন-পাঠন এবং নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। ২০২৬ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি এখন আর কেবল আবেগ বা দলীয় আনুগত্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়। তারা এখন ‘ডেটা-ড্রিভেন’ (Data-driven) বা তথ্যভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। এই পরিবর্তনের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের কিছু তত্ত্ব ও উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে- ১. মেরিটক্রেসি বনাম বংশপরম্পরা (তত্ত্ব: Meritocratic Leadership) বর্তমান তরুণরা রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের চেয়ে ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও মেধাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। যেমন: ২০২৬ সালের নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণরা কোনো নেতার পারিবারিক পরিচয়ের চেয়ে তার যোগ্যতা, বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান এবং সংকটকালীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে বেশি বিতর্ক করছে। তারা ‘যোগ্যতাই শ্রেষ্ঠত্ব’- এই বুদ্ধিবৃত্তিক তত্ত্বে বিশ্বাসী। ২. পলিসি বনাম স্লোগান (তত্ত্ব: Rational Choice Theory) তরুণরা এখন ফাঁকা স্লোগানের বদলে সুনির্দিষ্ট ‘পলিসি’ বা নীতিমালার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। যেমন- কোনো রাজনৈতিক দল ‘বেকারত্ব দূর করার’ সাধারণ প্রতিশ্রুতি দিলে তরুণরা তা গ্রহণ করছে না। বরং তারা প্রশ্ন তুলছে- ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে এআই (AI) মোকাবিলায় আপনাদের রোডম্যাপ কী?’ কিংবা ‘ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কর কাঠামো কেমন হবে?’ এই যে যৌক্তিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা, এটাই হলো বুদ্ধিবৃত্তিক আদর্শের লড়াই। ৩. ডিজিটাল জননিরাপত্তা ও নৈতিকতা (তত্ত্ব: Digital Sovereignty) ২০২৬-এর তরুণ প্রজন্মের কাছে ‘স্বাধীনতা’ মানে কেবল ভূখণ্ড নয় বরং তথ্যের সুরক্ষা এবং ইন্টারনেটে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। যেমন- সাইবার সিকিউরিটি আইন বা ডেটা প্রাইভেসির মতো জটিল বিষয়গুলো এখন পাড়ার চায়ের দোকানে তরুণদের আলোচনার বিষয়। যারা এই ডিজিটাল অধিকারের পক্ষে শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দিতে পারছে, তরুণ সমাজ সেই আদর্শের দিকেই ঝুঁঁকছে। ৪. জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন (তত্ত্ব: Intergenerational Justice) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষায় তরুণরা এখন আপসহীন। যেমন- কোনো বড় শিল্প প্রকল্প বা নগরায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তরুণরা বৈজ্ঞানিক তথ্য ও উপাত্ত নিয়ে লড়াই করছে। তারা কেবল উন্নয়ন চায় না, ‘টেকসই উন্নয়ন’ চায়। এটি একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান যা প্রচলিত ‘উন্নয়ন মানেই ইট-পাথর’- এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তরুণদের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে রাজনীতি এখন আর শুধুমাত্র মাঠের লড়াই নয় বরং এটি ল্যাপটপের কিবোর্ড এবং যুক্তির টেবিলে স্থানান্তরিত হয়েছে। ২০২৬ সালের তরুণরা এমন এক আদর্শ খুঁজছে যা তাদের মেধা ও আধুনিক বিশ্বের চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ। শিক্ষাব্যবস্থাকে বলা হয় আদর্শিক লড়াইয়ের সূতিকাগার। একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার পাঠ্যপুস্তক ও শ্রেণিকক্ষের আলোচনার মধ্য দিয়ে। আমরা যদি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিই, যদি তাদের সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical Thinking) করার দক্ষতা তৈরি না করি, তবে তারা কোনোদিনও সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবে না। বিশ্বের সেরা ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আজ আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম কেন নেই? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের গবেষণার অভাব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যদশার মধ্যে। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় উচ্চশিক্ষায় আমাদের গবেষণার বরাদ্দ এবং মান উভয়ই উদ্বেগজনকভাবে নিচের দিকে। এই শূন্যতা যদি পূর্ণ না হয়, তবে বিজাতীয় আদর্শ বা ক্ষতিকর মতবাদ আমাদের সমাজকে খুব সহজেই গ্রাস করে নেবে। উপমা দিয়ে বললে, একটি গাছ যেমন তার শেকড় থেকে রসদ সংগ্রহ করে টিকে থাকে, আদর্শের লড়াইও তেমনি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শেকড় থেকে প্রাণশক্তি পায়। যে আদর্শের কোনো শেকড় নেই তা বর্ষার কচুরিপানার মতো ভেসে যায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের জাতীয় জীবনে এক ধরনের শূন্যতা কাজ করছে। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য তথাকথিত বুদ্ধিজীবী নয় বরং প্রকৃত প্রজ্ঞাবান মানুষের প্রয়োজন। যারা কেবল ক্ষমতার তোষণ করবেন না বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের কথা বলবেন। মনে রাখতে হবে, বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যই হলো একটি জাতির সবচেয়ে বড় পরাজয়। পরিশেষে বলা যায়, আদর্শের লড়াই কোনো ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া নয় বরং এটি একটি সৃষ্টিশীল বিবর্তন। এই লড়াইয়ে জেতার অর্থ কাউকে রক্তাক্ত করা নয় বরং মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে সেখানে জ্ঞানের আলো জ্বালানো। বর্তমানে আমরা যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তার টেকসই সমাধান কোনো সাময়িক মেরামতে নেই; আছে মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণে। পত্রিকা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা যখন কোনো একটি মত প্রকাশ করি, তখন সেটি কেবল একটি কলাম বা পোস্ট নয়, সেটি একটি আদর্শিক বীজ। এই বীজ যদি যুক্তিনির্ভর এবং জনকল্যাণমুখী হয়- তবে তা একদিন বিশাল মহীরুহে পরিণত হবে। ‘আদর্শের লড়াই হয় বুদ্ধিবৃত্তিক’- এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে যদি আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি, তবেই আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্থবহ হবে। তাই সংকীর্ণতা আর বিদ্বেষ নয়, মেধা ও যুক্তির লড়াই হোক আদর্শিক বিজয়ের হাতিয়ার। কারণ দিনশেষে ডানাভাঙা পাখির মতো ছটফট করে পেশিশক্তি, আর ঈগলের মতো আকাশে উড়ে বেড়ায় জয়ী আদর্শ। জয় হোক কলমের, জয় হোক সত্য ও সুন্দরের। লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
১৮ মে ২০২৬
কিশোর গ্যাংয়ের আঁতুড়ঘর সমাচার
মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল:: সময়ের পরিক্রমায় সমাজ বিবর্তিত হয়, কিন্তু সেই বিবর্তন যখন নেতিবাচক বাঁক নেয়, তখন তা জাতির জন্য অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়ায়। একটি জাতির প্রাণশক্তি হলো তার তরুণ প্রজন্ম। সেই তারুণ্য যখন সৃজনশীলতার পথ ছেড়ে ধ্বংসাত্মক ‘গ্যাং কালচার’-এর জালে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা কেবল একটি সামাজিক সমস্যা থাকে না বরং জাতীয় অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে বাংলাদেশে ‘কিশোরগ্যাং’ শব্দটি একটি গভীর ক্ষত ও আতঙ্কের সমার্থক হয়ে উঠেছে। তুচ্ছ ঘটনা থেকে রক্তপাত, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং ইভটিজিংয়ের মতো ভয়াবহ অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়া এখন প্রাত্যহিক খবরে পরিণত হয়েছে। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করিডোর- সর্বত্রই এদের দাপট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোর অপরাধের মাত্রা ও ধরণ উভয়ই আমূল বদলে গেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, বর্তমানে রাজধানী ঢাকাতেই অন্তত ৮০টির বেশি কিশোরগ্যাং সক্রিয় রয়েছে। পুলিশি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীর আটটি বিভাগে অন্তত ৫২টি গ্যাং চিহ্নিত করা হয়েছে- যার মধ্যে মিরপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি (১৩টি গ্যাং এবং ১৭২ জন সদস্য) কিশোর অপরাধীর দৌরাত্ম্য বিদ্যমান। ২০২৩ সালে সারা দেশে পুলিশ রেকর্ডভুক্ত সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১,৩৮২ জন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের শুরুর দিকে র্যাব ও পুলিশি অভিযানে শত শত কিশোর আটক হলেও অপরাধের গতি থামেনি বরং তা নিত্যনতুন এলাকায় ডালপালা মেলছে। ঢাকা শিশু আদালতের গত ১৫ বছরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে কেবল কিশোরগ্যাংয়ের দ্বন্দ্বেই সংঘটিত হয়েছে প্রায় ২০০টি হত্যাকাণ্ড। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে সংকটটি এখন আর ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ নয় বরং গভীর এক কাঠামোগত সমস্যা। কিশোরগ্যাং গড়ে ওঠার আঁতুড়ঘর বিশ্লেষণ করলে তিনটি ধারাকে আমরা আনতে পারি। যথা- ১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: কিশোরগ্যাং গড়ে ওঠার অন্যতম প্রাথমিক কেন্দ্র হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করিডোর ও খেলার মাঠ। বন্ধুত্বের আড়ালে গ্যাংস্টার হওয়ার পাঠ শুরু এখানেই। অনেক ক্ষেত্রে একই স্কুলের সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব বা ‘হিরোইজম’ জাহির করার মানসিকতা থেকে ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি হয়। পড়াশোনার চেয়ে ‘আধিপত্য বিস্তার’ যেখানে মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়- সেখানেই জন্ম নেয় গ্যাং কালচার। পরিসংখ্যান বলছে, গ্যাং সদস্যদের একটি বিশাল অংশই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী- যারা মূলত সহপাঠী বা বড় ভাইদের কুপ্রভাবে বিপথে ধাবিত হয়েছে। অনেক সময় কোচিং সেন্টারের আড্ডাতেও এসব গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২. রাজনৈতিক ছত্রছায়া: কিশোরগ্যাং কালচার ফুলেফেঁপে ওঠার পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী জ্বালানি হলো অপরাজনীতি। স্থানীয় পর্যায়ের ‘বড় ভাই’ বা রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের মিছিলে লোক বাড়ানো, প্রভাব বিস্তার এবং প্রতিপক্ষকে দমানোর হাতিয়ার হিসেবে কিশোরদের ব্যবহার করে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া পাওয়ার কারণে এসব কিশোর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে বলে মনে করে। রাজনৈতিক এই মদদ কিশোর অপরাধীদের মনে ‘দায়মুক্তির’ ধারণা তৈরি করে- যা তাদের বেপরোয়া ও খুনি করে তুলছে। এবং ৩. সামাজিক অবক্ষয় ও ডিজিটাল অন্ধকার: প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার ও নৈতিক শিক্ষার অভাব কিশোরদের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে। টিকটক, লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মে ‘ভাইরাল’ হওয়ার নেশায় কিশোররা বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শন ও উগ্র আচরণ করে। এছাড়া মাদকের সহজলভ্যতা এবং পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠের অভাব তাদের সৃজনশীলতা কেড়ে নিচ্ছে। পরিবারের সাথে দূরত্বের কারণে অনেক কিশোর নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে পাড়ার বখাটেদের সাথে মিশে গিয়ে অপরাধের জগতে পা রাখছে। বাংলাদেশে বর্তমানে কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে বেশ কিছু সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং পারিপার্শ্বিক কারণ দায়ী বলে গন্য করা হয়। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- (ক) সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতা: মা-বাবার মধ্যে দ্বন্দ্ব, সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া বা অতিরিক্ত শাসন ও উদাসীনতা কিশোরদের বাইরে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য করে। বাবা-মায়ের ব্যস্ততা বা উদাসীনতার কারণে কিশোররা একাকীত্বে ভোগে এবং বাইরের সঙ্গীদের প্রতি বেশি ঝুঁঁকে পড়ে। এছাড়া ঘরে অশান্তি থাকলে কিশোররা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং শান্তির খোঁজে বা ক্ষোভ মেটাতে গ্যাং কালচারে জড়িয়ে যায়। (খ) হিরোইজম বা বীরত্ব প্রদর্শনের ইচ্ছা: এই বয়সে কিশোরদের মধ্যে নিজেকে ‘বড়’ বা ‘ক্ষমতাশালী’ দেখানোর একটি প্রবণতা থাকে। গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা বা অন্যদের ভয় দেখানোকে তারা বীরত্ব মনে করে। (গ) রাজনৈতিক অপব্যবহার: অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ‘বড় ভাই’ বা রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করেন। তাদের প্রশ্রয় এবং ক্ষমতার দাপট কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সাহসী করে তোলে। (ঘ) আকাশ সংস্কৃতি ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব: বিভিন্ন মুভি বা ওয়েব সিরিজে গ্যাংস্টার লাইফস্টাইলকে গ্ল্যামারাইজড বা আকর্ষণীয়ভাবে দেখানো হয়। টিকটক বা লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার নেশাও তাদের গ্যাং গঠনে উৎসাহিত করে। (ঙ) মাদক, সুস্থ বিনোদনের অভাব ও অর্থলিপ্সা: মাঠের অভাব বা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ না থাকায় কিশোররা অলস সময় কাটায়। এই অবসরে তারা মাদকের সংস্পর্শে আসে এবং মাদকের টাকা জোগাড় করতে বা দ্রুত টাকা আয়ের নেশায় তারা ছোটখাটো অপরাধী চক্রে জড়িয়ে পড়ে। ছোট সেই চক্রটিই ছিনতাই বা গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এবং (চ) এলাকাভিত্তিক আধিপত্য (Senior-Junior Conflict): এলাকায় নিজেদের সিনিয়র প্রমাণ করা বা জুনিয়রদের ওপর দাপট দেখানোর মানসিকতা থেকেও ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি হয়- যা পরে বড় গ্যাংয়ে রূপ নেয়। মূলত পরিচয় সংকট (Identity Crisis) এবং নিরাপত্তাহীনতা থেকে কিশোররা গ্যাং গড়ে তোলে। যখন তারা পরিবার বা সমাজ থেকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না, তখন একটি দলের অংশ হয়ে তারা সেই গুরুত্ব বা ‘পাওয়ার’ পাওয়ার চেষ্টা করে। এছাড়া আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি তাদের এই পথে টিকে থাকতে সাহায্য করছে। স্কুল-কলেজে বড় ভাইদের সালাম না দেওয়া বা ‘সম্মান’ না করা নিয়ে ছোটখাটো বিবাদ থেকে স্কুল বা পাড়ার বন্ধুরাই প্রথমে আড্ডা দিতে দিতে ছোট গ্রুপ তৈরি করে এবং সিনিয়রিটি-জুনিয়রিটি দ্বন্দ্ব শুরু হয়- পরে তা বড় গ্যাং- এ রূপান্তর হয়। ফেসবুক বা মেসেঞ্জার গ্রুপে চ্যাট করতে করতে তারা সংঘবদ্ধ হয় এবং পরে বাস্তবে মারামারি বা বিবাদে জড়ায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে আড্ডা দেওয়া তথাকথিত ‘বড় ভাই’রা জুনিয়রদের প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের দলে ভেড়ায়- এভাবেই কিশোরগ্যাং গড়ে ওঠে। কিশোরগ্যাংয়ের কারণে বর্তমানে সাধারণ মানুষের চলাফেরা দুরূহ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। ছিনতাই ও শ্লীলতাহানির মতো ঘটনাগুলো সরাসরি এই গ্যাং কালচারের সাথে যুক্ত। এই কিশোররা এক পর্যায়ে বড় মাপের অপরাধী সিন্ডিকেটে রূপান্তরিত হচ্ছে- যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। কেবল কঠোর আইন বা জেল দিয়ে কিশোর অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব নয়। সন্তানদের বন্ধুদের সম্পর্কে খোঁজ রাখা এবং তাদের সাথে গুণগত সময় কাটানো অভিভাবকদের প্রথম দায়িত্ব। পরিবারের সদস্যদের সাথে নৈতিক শিক্ষার চর্চাও বাড়াতে হবে। এজন্য প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। যেমন- ১. প্রাতিষ্ঠানিক বা স্কুলভিত্তিক পদক্ষেপ (School-based Measures): শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে শুধুমাত্র পাঠদানের বাইরেও নজরদারি ও সচেতনতায় গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল ও কলেজের প্রবেশপথ, করিডোর এবং আশেপাশের আড্ডার জায়গাগুলোতে সিসিটিভি’র নজরদারি জোরদার করতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলর বা মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দিতে হবে- যাতে কিশোরদের রাগ, হতাশা বা আচরণগত সমস্যাগুলো শুরুতেই সমাধান করা যায়। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং স্কাউটিংয়ের মতো কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত রাখতে হবে- এটি তাদের দলবদ্ধ হওয়ার শক্তিকে ইতিবাচক দিকে প্রবাহিত করবে। কোনো গ্যাং বা গ্রুপের বিশেষ চিহ্ন, লোগো বা পোশাক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিষিদ্ধ করতে হবে। ২. সরকারি ও আইনি পদক্ষেপ (Government & Legal Actions): সরকার বর্তমানে কিশোর অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করেছে। বাংলাদেশ পুলিশ বর্তমানে এলাকাভিত্তিক ‘বিট পুলিশিং’ এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়ে কিশোরগ্যাং-এর ‘গডফাদার’ বা আশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করছে- এটির কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। অপরাধে জড়ানো কিশোরদের সাথে শিশুবান্ধব আচরণ করে তাদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে প্রতিটি থানায় স্থাপনকৃত চাইল্ড হেল্প ডেস্কের (CADO) কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা হচ্ছে। কারণ কিশোরগ্যাং কালচারের সাথে মাদক ওতপ্রোতভাবে জড়িত- এক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। ৩. সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা (Social & Family Awareness): সন্তান কার সাথে মিশছে, অনলাইনে কী করছে এবং কার সাথে বাইরে আড্ডা দিচ্ছে তা নিয়মিত তদারকি করতে অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যদের সর্বদা সদর্ক থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতি মাসে অভিভাবক সমাবেশ করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক মিছিল বা শো-ডাউনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার না করার জন্য কঠোর নির্দেশনা জারি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কিশোররা একটি রাষ্ট্রের স্থপতি। তারা আমাদের জাতীয় সম্পদ- কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তি স্বার্থের হাতিয়ার নয়। তাদের অপরাধের আঁতুড়ঘরগুলো যদি আমরা এখনই চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে এক বুদ্ধিহীন ও অপরাধপ্রবণ প্রজন্মের ভার সইতে হবে। তাদেরকে সুস্থ ধারার শিক্ষায় দীক্ষিত করতে না পারলে আগামির বাংলাদেশ এক মেধাভীতি ও অস্থিরতার সম্মুখীন হবে। সময় এসেছে শিকড় থেকে এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার। আমাদের সন্তানদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতেই হবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার- সবাইকে এক হয়ে ‘কিশোরগ্যাং’ নামক এই আগুনের লেলিহান শিখা নেভাতে হবে। লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
০২ মে ২০২৬
বৈশাখের কবিতা : ঐতিহ্যের শেকড় ও আধুনিকতার মহাকাব্য
মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল:: বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে পহেলা বৈশাখ কেবল একটি পঞ্জিকার পাতা উল্টানো নয়, বরং এটি একটি জাতিসত্তার পুনর্জাগরণ। বাঙালির সম্প্রীতির শ্রেষ্ঠ উৎসব পহেলা বৈশাখ। এই উৎসবের মূলে রয়েছে যেমন ফসলি ঐতিহ্যের ইতিহাস, তেমনি জড়িয়ে আছে বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের চেতনা। মোগল সম্রাট আকবরের ‘ফসলি সন’ থেকে শুরু করে আজকের ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ পর্যন্ত বৈশাখের যে বিবর্তন, তার সমান্তরাল এক ধারা বয়ে চলেছে বাংলা কবিতায়। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে রচিত কবিতাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশাখ এসেছে দ্বিবিধ রূপে- একদিকে জীর্ণকে মুছে ফেলার প্রলয়ংকরী শক্তি হিসেবে, অন্যদিকে নতুনের আবাহনে প্রশান্তির স্নিগ্ধতা নিয়ে। এখানে কবিরা কেবল ঋতু পরিবর্তনের বন্দনা করেননি, বরং এর আড়ালে লুকিয়ে রেখেছেন দ্রোহ, দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক গভীর দর্শন। যুগ যুগ ধরে বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ বহুমাত্রিকতা বজায় রেখেছে। মূলত: বৈশাখের দীর্ঘ পথপরিক্রমার শ্রেষ্ঠ রূপকার আমাদের কবিরা। বাংলা কবিতায় দ্রোহ, শুদ্ধি এবং জীর্ণতা ঝরানো নতুনের আবাহনে এক চিরন্তন শক্তির উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। মধ্যযুগের কাব্য থেকে আধুনিক কালের নাগরিক পঙক্তিমালা- সবখানেই বৈশাখ তার আপন মহিমায় উদ্ভাসিত। ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ-বাস্তবতায় নীল দর্পণ ও বৈশাখের তপ্ত রূপ ধরা পড়েছে কবি ও নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের কলমে। তিনি বৈশাখকে দেখেছেন বাংলার সাধারণ কৃষকের হাহাকার ও নীলকরদের শোষণের প্রেক্ষাপটে। তাঁর কবিতায় বৈশাখ কেবল প্রকৃতির রুদ্র রূপ নয়- বরং শোষিত মানুষের তপ্ত নিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। বৈশাখের সেই দাবদাহের বর্ণনায় তিনি লিখেছেন- ‘বৈশাখের রৌদ্রে যেন অগ্নিবৃষ্টি হয়, তপ্ত বালুকারাশি অঙ্গে দহে অতিশয়।’ দীনবন্ধুর বৈশাখ ছিল প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। বৈশাখী কবিতার আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল অনিবার্য। রবীন্দ্রনাথের ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের ‘বৈশাখ’ কবিতায় বৈশাখ এক ‘নিরাসক্ত সন্ন্যাসী’, যে জীর্ণতাকে মুছে দিয়ে ধরাকে শুচি করে। অন্যদিকে নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের ‘প্রলয়োল্লাস’-এ বৈশাখ হলো ‘কাল্-বোশেখির ঝড়’, যা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রতীক। নজরুলের কাছে বৈশাখ মানেই- ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখির ঝড়/তোরা সব জয়ধ্বনি কর!’ বাংলা কবিতায় বৈশাখকে এক পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বৈশাখকে দেখেছেন এক ‘তাপস’ রূপে, যে তার নিশ্বাস দিয়ে মরণোন্মুখ সমাজকে জাগিয়ে তোলে। তাঁর কালজয়ী গান ও কবিতায় বৈশাখ এভাবেই মূর্ত হয়েছে- ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ। তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥’ আবার ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত ‘বৈশাখ’ কবিতায় আমরা দেখি সেই অমোঘ আহ্বান- ‘ওগো দুর্দম, ওগো নির্মল, ওগো মুক্ত, তোমার চরম দীপ্তির সাথে আমাদের করো যুক্ত।’ বৈশাখ স্মরণে তিনি লিখেন- ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ এখানে বৈশাখ কেবল একটি মাস নয়, বরং সমাজ-সংসারের ধুলোবালি ও জঞ্জাল পরিষ্কারের এক আধ্যাত্মিক শক্তি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গানে বৈশাখ কেবল একটি ঋতু নয়- এটি অন্যায় ও জীর্ণতাকে ধ্বংস করার এক বিপ্লবী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নজরুল নিজেই ছিলেন বৈশাখের প্রতীক- অশান্ত, সাহসী এবং বৈরী। নজরুলের সাহিত্যে বৈশাখের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক হলো- ১. কালবৈশাখী ও বিপ্লবের রূপক: নজরুলের কাছে বৈশাখ মানেই ‘কালবৈশাখী’, যা পরাধীনতা ও অবিচারের শৃঙ্খল ভাঙার এক মহাপ্রলয়। প্রলয়োল্লাস কবিতায় তিনি বৈশাখকে ধ্বংস ও সৃষ্টির এক অদম্য শক্তি হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রবল জ্বরের মধ্যে ১৯২৪ সালে রচিত ‘ঝড়ঃ পশ্চিম তরঙ্গ’ কবিতায় বৈশাখী ঝড়ের রুদ্র রূপ ফুটে উঠেছে। ২. জীর্ণতা দূর করে নতুনের আবাহন: রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ যেখানে শান্ত ও আধ্যাত্মিক, নজরুলের বৈশাখ সেখানে বিদ্রোহী ও বৈপ্লবিক। তিনি বৈশাখকে আবাহন করেছেন পুরোনো আবর্জনা ঝেঁটে ফেলে নতুন পৃথিবী গড়ার আহ্বান জানিয়ে। ৩. নজরুল গীতিতে বৈশাখ বন্দনা: নজরুল তাঁর গানে বৈশাখকে বিভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন। নজরুল বৈশাখী ভোরকে ‘রুদ্রাণী জননী’ হিসেবে অভিহিত করে প্রকৃতি ও ঋতুর বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তুলেছেন। নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে তিনি লিখেছেন, ‘নওরোজের এই উৎসবে, ওঠ জেগে আজ ওঠ সবে’। ৪. বৈশাখের প্রতীকী উপস্থিতি: নজরুল তাঁর কবিতায় বৈশাখকে ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ রূপে চিত্রায়িত করেছেন। তাঁর মতে, বৈশাখ কেবল দহন করে না বরং এটি মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে তোলে এবং সমস্ত শিকল ভেঙে শাশ্বত অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় বৈশাখের কালবৈশাখী ঝড় হয়ে উঠেছে বিপ্লবের প্রতীক। নজরুলের কাছে বৈশাখ মানে স্থিতাবস্থার ভাঙন এবং নতুন এক পৃথিবী সৃষ্টির উন্মাদনা। নজরুল বৈশাখকে গ্রামীণ অভাবী মানুষের হাহাকারের সাথেও মিশিয়েছেন। তাঁর ‘ছায়ানট’ কাব্যের ‘বৈশাখ’ কবিতায় রৌদ্রদগ্ধ দুপুরের এক বিষন্ন কিন্তু শক্তিশালী চিত্র ফুটে ওঠে। জসীমউদ্দীন বা পল্লীকবিদের কবিতায় বৈশাখ এসেছে গ্রামীণ জীবনের সাধারণ অনুষঙ্গ হিসেবে। গ্রামবাংলার মেলা, মেঠো বাঁশির সুর আর ধুলোমাখা মেঠোপথ তাঁর কবিতায় এক ভিন্ন স্বাদের বৈশাখ উপহার দেয়। বৈশাখী মেলা নিয়ে তাঁর পঙতিমালায় ফুটে ওঠে চিরন্তন বাংলার চিত্র- ‘রঙিন রঙিন মুখোশ পরে নাচে ছেলের দল, বৈশাখী মেলায় ভিড় করেছে গ্রামবাসী চঞ্চল।’ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবিদের কলমে বৈশাখ আরও বেশি লোকজ ও রাজনৈতিক তাৎপর্য পায়। জসীমউদ্দীন বৈশাখকে দেখেছেন গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের আনন্দ-বেদনার মিশেলে। অন্যদিকে, কবি ফররুখ আহমদ তাঁর ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যে বৈশাখকে দেখেছেন এক তপ্ত ও তৃষ্ণার্ত পৃথিবীর হাহাকার হিসেবে- ‘বৈশাখী মেঘে জাগে না তো আজো আশার রক্ত-লেখ, উত্তপ্ত এই পিয়াসি ধূলায় জাগে না তো অভিষেক।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে মৌলবাদবিরোধী এক সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের নাম। কবি শামসুর রাহমান বৈশাখকে নাগরিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর কাছে বৈশাখ মানে রমনার বটমূলের জমায়েত আর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। তাঁর কবিতায় বৈশাখ বারবার ফিরে এসেছে স্বৈরশাসন ও অপশক্তির বিরুদ্ধে এক বজ্রনিনাদ হয়ে। কবি আল মাহমুদের কবিতায় বৈশাখ এসেছে চিরন্তন বাংলার মাটির গন্ধে। তাঁর ‘সোনালী কাবিন’ এর আবহে বৈশাখী মেলা, নাগরদোলা আর লোকজ ঐতিহ্যের এক চমৎকার রসায়ন পাওয়া যায়। তিনি বৈশাখকে দেখেছেন উৎপাদনশীলতা ও উর্বরতার প্রতীক হিসেবে। জননী সাহসিকা সুফিয়া কামালের কবিতায় বৈশাখ এসেছে এক ভিন্ন মাত্রায়। তিনি বৈশাখকে দেখেছেন নারীত্বের মমতা ও সাহসের মিশেলে। তাঁর ‘সাঁঝের মায়া’ বা পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে বৈশাখের রুদ্র রূপের চেয়ে তার সৃজনশীল শক্তির জয়গান গীত হয়েছে। তিনি বৈশাখকে আবাহন করেছেন অশুভ শক্তির বিনাশী হিসেবে। তাঁর পঙক্তিতে ফুটে ওঠে বাংলার চিরন্তন রূপ- ‘এসো বৈশাখ, এসো হে ঋতুরাজ, মুছে দাও যত কালিমা ও লাজ।’ সুফিয়া কামালের বৈশাখী কবিতা আমাদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রেরণা জোগায়। সত্তরের দশকের কালজয়ী কবি নির্মলেন্দু গুণ বৈশাখকে দেখেছেন রাজনীতির উত্তাল প্রেক্ষাপটে। তাঁর কবিতায় বৈশাখ কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয় বরং তা বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের সাথে যুক্ত। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘চাষাভুষার কাব্য’-এ তিনি বৈশাখকে মেহনতি মানুষের উৎসব হিসেবে চিত্রিত করেছেন। নির্মলেন্দু গুণের পঙক্তিতে বৈশাখ ধরা দেয় এভাবে- ‘বৈশাখ মানেই কালবৈশাখীর রণতূর্য, বাংলার আকাশে নতুন এক সূর্য।’ তিনি বৈশাখকে নাগরিক জীবনের কোলাহল থেকে বের করে নিয়ে গেছেন সরাসরি মাটির কাছাকাছি। আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠস্বর আযাদ কামাল বৈশাখকে দেখেছেন শেকড় সন্ধানী দৃষ্টিতে। তাঁর কবিতায় বৈশাখ একাধারে প্রেম ও দ্রোহের সমীকরণ। সমকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাঙালির পরিচয় সংকটের কালে আযাদ কামালের কবিতা আমাদের ঐতিহ্যমুখী হতে শেখায়। তাঁর কবিতায় বৈশাখের রুদ্রতা ও মেলা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তাঁর কবিতায় বৈশাখী ঝড়ের তান্ডব আর নতুনের আগমনের এক চমৎকার চিত্র ফুটে ওঠে- যা পাঠকদের জাতিগত ঐক্যের দিকে আহ্বান জানায়। সব সময়ের কবিদের কাছে পহেলা বৈশাখ হয়ে উঠেছে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেরণা। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধ- সবখানেই বৈশাখের তেজ বাঙালিকে শক্তি জুগিয়েছে। আধুনিক বিশ্বায়নের যুগেও বৈশাখ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় আমাদের শিকড়ের কথা, আমাদের নিজস্ব পরিচয়ের কথা। পহেলা বৈশাখের কবিতা আসলে বাঙালির বিবর্তনেরই দর্পণ। মধ্যযুগের কবিদের বর্ণনা থেকে আধুনিক কবিদের দ্রোহ- সবখানেই বৈশাখ এক অবিনাশী শক্তি। আজ যখন বিশ্বায়ন আর অপসংস্কৃতির ভিড়ে বাঙালির শেকড় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম, তখন এই কবিতাগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আমরা সেই জাতি, যারা ঝড়ের রাতেও প্রদীপ জ্বালিয়ে নতুনের আবাহন গাইতে জানি। তাই পহেলা বৈশাখ কেবল একটি দিন নয়- এটি বাঙালির চিরন্তন লড়াই ও উৎসবের এক কাব্যিক মহাকাব্য। লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
১৪ এপ্রিল ২০২৬