দৃষ্টি রিপোর্ট:
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সুশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ ওরফে বাবুল। বিভাগীয় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষকদের বদলি বাণিজ্য ও বিত্তবানদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে গত এক দশকে তিনি কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এছাড়া বন বিভাগের প্রায় ১২ একর জমি দখল করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার ধলিপাড়া এলাকার সাবেক ফরেস্টগার্ড মৃত ছামান আলীর ছেলে নূর মোহাম্মদ ওরফে বাবুল নিজ এলাকায় বন বিভাগের প্রায় ১২ একর শাল বন জবরদখল করেছেন। দামি দামি গজারি গাছ কেটে সরকারি বনের সেই জমিতেই গড়ে তুলেছেন মাল্টা বাগান, গরুর খামার ও একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স ভবন। মাল্টা বাগানটি আবার লিজ দিয়েছেন স্থানীয় সাইফুল ইসলামকে। শিক্ষা প্রশাসনে নিজের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নূর মোহাম্মদ গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই চক্রের মূল সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী পাবনা সদর উপজেলার সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিদা শবনম। ঢাকা ও পাবনা- এই দুই অঞ্চলের শিক্ষা প্রশাসনকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছেন এই দুই কর্মকর্তা।

অভিযোগ রয়েছে- সাধারণ শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, নিয়মবহির্ভূত পদায়ন এবং অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। বদলি ও পদোন্নতির ফাঁদে ফেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে এই সিন্ডিকেট প্রতিনিয়ত লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করছে।
অনুসন্ধানে নূর মোহাম্মদের বিপুল সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। রাজধানী ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং সখীপুর পৌরসভায় একাধিক বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি, অভিজাত ফ্ল্যাট ও নামীদামি ব্র্যান্ডের গাড়ির মালিক বনে গেছেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে নিজের ও বেনামে জমা রয়েছে কোটি কোটি টাকা। একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয় দিয়ে এত অল্প সময়ে কীভাবে এই পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হওয়া সম্ভব- তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ শিক্ষা অধিদপ্তরের সৎ কর্মকর্তারা।
এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আরও ভয়ংকর অভিযোগ রয়েছে। নূর মোহাম্মদ ও শাহিদা শবনম সুকৌশলে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের অনৈতিক ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইলিং করতেন। পরবর্তীতে সম্মানহানি ও মামলার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিচ্ছে এই চক্র।

লোকলজ্জার ভয়ে এতদিন অনেকেই মুখ না খুললেও, সম্প্রতি তাদের এই বেপরোয়া অপকর্মের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ভুক্তভোগী কতিপয় ব্যক্তি এই চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। ওই শিক্ষা কর্মকর্তা ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় থাকলেও নির্বিকার প্রশাসন। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে পার পেয়ে যাচ্ছেন তারা। তদন্ত থমকে যাওয়া কিংবা ধামাচাপা পড়ার কারণে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
এদিকে নুর মোহাম্মদ ওরফে বাবুলের মাল্টা বাগান লিজ নেওয়া সাইফুল ইসলাম জানান, আটিয়া বন অধ্যাদেশের কারণে জমির কাগজপত্রে জটিলতা রয়েছে। এ কারণে ভূমি অফিস খাজনা নিচ্ছেনা এবং এজন্যই ওই জমির উপর ব্যাংক ঋণও দিচ্ছেনা।
সরেজমিনে নানাজনের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ ওরফে বাবুলের সাক্ষাত না পেয়ে তার মোবাইল ফোনে বার বার চেষ্টা করেও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান জামাল মিয়া জানান- নুর মোহাম্মদ নামে নয়, এলাকায় তিনি বাবুল হিসেবে পরিচিত। এলাকায় তাকে ভালো মানুষ হিসেবেই জানে। তবে বনের জায়গা দখলের বিষয়ে তিনি জানান, এতদাঞ্চলের সবারই ‘আটিয়া বন অধ্যাদেশ’র কারণে খাজনা-খারিজ(নামজারি) করতে পারছেনা।
টাঙ্গাইলের সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব জানান, বনের জয়গা জবরদখল করার এখতিয়ার কারো নেই। যদি জবরদখলের কোনো ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।