মির্জাপুরে ২০ গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা বদলে গেল ব্যক্তি উদ্যোগে

 খবর পেলেই ছুটে যায় ইটের গাড়ি  বাবার জনকল্যাণের উত্তরাধিকার  একজন সেবকের ৬২ সড়ক সংস্কারের গল্প
D
Dristy TV
মির্জাপুর • প্রকাশিত: ৪ ঘণ্টা আগে
মির্জাপুরে ২০ গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা বদলে গেল ব্যক্তি উদ্যোগে

মু. আবিদ মল্লিক জয়:

সরকারি কোনো প্রকল্প নয়, নেই কোনো সংস্থার অর্থায়ন। স্রেফ গ্রামীণ জনপদের মানুষের চিরচেনা দুর্ভোগ লাঘবে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনন্য এক নজির সৃষ্টি করেছেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার এক সমাজসেবক। মির্জাপুর উপজেলার ৯নং বহুরিয়া ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের ৬২টি গ্রামীণ সড়ক টানা তিন বছর ধরে নিজের অর্থে সংস্কার করেছেন। বর্তমানেও সড়ক সংস্কার করে চলেছেন ওই ইউনিয়নের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মরহুম জয়নাল সিকদারের ছেলে বিএনপি নেতা আব্দুস ছাত্তার সিকদার।

একসময় যেসব কাদামাটির পথ, খানাখন্দ আর বর্ষার পানিতে তলিয়ে থাকা রাস্তা ছিল বহুরিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দাদের নিত্যদিনের অভিশাপ। আব্দুস ছাত্তার সিকদারের কল্যাণে আজ সেখানে লেগেছে স্বস্তির ছোঁয়া। তাঁর এই মহৎ উদ্যোগের ফলে বদলে গেছে পুরো গ্রামীণ জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংস্কারের পূর্বে এই ২০টি গ্রামের সড়কগুলোর অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অসুস্থ রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে নেওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীর ভোগান্তির কোনো শেষ ছিল না। অনেক সময় ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে গ্রামে জরুরি যানবাহন পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারত না। সাধারণ মানুষের এই অবর্ণনীয় কষ্ট ছুঁয়ে যায় আব্দুস ছাত্তার সিকদারকে। কোনো ক্ষমতার মোহে নয় বরং মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি নিজ খরচে এগিয়ে আসেন। গত তিন বছরে প্রায় তিন শতাধিক মাহিন্দ্র ট্রাকে করে ভাঙা ইট(রাবিশ) ফেলে চলাচলের উপযোগী করেছেন এসব সড়ক। তাঁর বাবা মরহুম জয়নাল সিকদারও পরোপকারী ও সমাজসংস্কারক ছিলেন।

বহুরিয়া ইউনিয়নের গবড়া গ্রামের বাসিন্দা খোরশেদ আলম, হাবিবুর রহমান মুন্না, চান্দুলিয়া গ্রামের লিটন মিয়া, আমজাদ হোসেন, কোট বহুরিয়া গ্রামের শরিফুল সিকদার সুজন, রফিকুল আলম, বহুরিয়া গ্রামের আল এমরান খান, আনিছুর রহমান খান, আড়াইপাড়া গ্রামের আক্কাস আলী, নাজমুল ইসলাম, গেড়ামেরা গ্রামের ময়নাল হোসেন, ইন্নছ আলী সহ অনেকেই জানান, ছাত্তার সিকদারের এই সেবামূলক কার্যক্রম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বর্ষায় বা বছরের যেকোনো সময়ে কোনো রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লেই স্থানীয়রা তাঁকে খবর দেন। আর খবর পাওয়া মাত্রই তাঁর নিজস্ব ইটভাটা থেকে পৌঁছে যায় ইটের গাড়ি। এমনকি মানুষের জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো সময় রাস্তায় ফেলার জন্য তাঁর ইটভাটায় সবসময় আলাদা করে ভাঙা ইট(রাবিশ) জমিয়ে রাখা হয়।

চেয়ারম্যানের সন্তান হিসেবে বাবার জনকল্যাণমূলক কাজের ধারাকে বজায় রেখে আব্দুস ছাত্তার সিকদার এলাকায় আজ এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। সরকারি বরাদ্দের আশায় বসে না থেকে একজন সাধারণ নাগরিকও যে চাইলে সমাজকে বদলে দিতে পারেন, মির্জাপুরের আব্দুস ছাত্তার সিকদার তা প্রমাণ করে দেখালেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকার সর্বস্তরের মানুষ।

ওই ইউনিয়নের দিঘুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা খলিলুর রহমান, আরশেদ আলী, কোরবান আলী, গৃহবধু নাজমেআরা বেগম, মর্জিনা আক্তার সহ অনেকেই জানান, গ্রামীণ উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। এমন বাস্তবতায় জনপ্রতিনিধি না হয়েও নিজের অর্থ ব্যয় করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় ছাত্তার হয়ে উঠেছেন এলাকার জনপ্রিয় একজন মানুষ। শুধু রাস্তা সংস্কারই নয়, এলাকার মানুষের বিপদে-আপদেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তিনি।

বহুরিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলহাজ হোসাইন বলেন, দক্ষিণ মির্জাপুরে বিশেষ করে বহুরিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ আমলে কোন উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ড হয়নি। যা বরাদ্দ এসেছে তা হরিলুট করে ভাগ বাটোয়ারা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পকেট ভারি করেছেন। ছাত্তার নিজস্ব অর্থায়নে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করে যাচ্ছেন।

মির্জাপুর উপজেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আব্দুস ছাত্তার সিকদার জানান, নিজের জায়গা থেকে যতটুকু সম্ভব মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। তিন বছর ধরে এভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এলাকার মানুষ চাইলে এবং দলীয় মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে। তবে নির্বাচনে অংশ নেই বা না নেই মানুষের সেবা করা অব্যাহত থাকবে।

মির্জাপুর উপজেলা প্রকৌশলী(এলজিইডি) মো. জালাল উদ্দিন খান জানান, তিনি মির্জাপুরে নতুন যোগদান করেছেন। বহুরিয়া ইউনিয়নের ছাত্তার সাহেবের সমাজসেবামূলক কাজ দেখে তিনি খুবই খুশি। সবাই যদি যার যার জায়গা থেকে সড়ক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণে সচেতন হয়, তাহলে সড়কের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং জনসাধারণ সুবিধা পাবে।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন জানান, গ্র্রামীণ সড়কগুলো সচল রাখা এবং জনগণের চলাচলের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি বা সামাজিক উদ্যোগ সব সময়ই প্রশংসনীয়। আব্দুস ছাত্তার সিকদার সাহেব জনপ্রতিনিধি না হয়েও সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে যেভাবে অবদান রাখছেন, তা সত্যিই একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ এলজিইডির গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাঁর এই মহৎ কাজকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

একই বিষয়ের আরও খবর